• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 16 October, 2026

টাকার পতন রুখতে গিয়ে অর্ধেক তহবিলই শেষ: ১৪০ বিলিয়ন ডলারের ভাণ্ডার ভেঙে ফেলল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

ডলারের নিরিখে টাকাকে ৯৭-এর গণ্ডিতে বেঁধে রাখতে বিশেষ তহবিলের ৮০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে আরবিআই। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও বিদেশি লগ্নি সরার জেরে চাপে ফোরেক্স রিজার্ভ।

টাকার পতন রুখতে গিয়ে অর্ধেক তহবিলই শেষ: ১৪০ বিলিয়ন ডলারের ভাণ্ডার ভেঙে ফেলল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। (File Photo: IANS)

ভারতীয় মুদ্রার অবাধ পতন রুখতে গিয়ে নিজেদের বিশেষ বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারের (foreign exchange reserves) অর্ধেকটাই খরচ করে ফেলেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI)। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে টাকার জোগান ও মান স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি তহবিল গড়ে তুলেছিল দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ডলারের ক্রমবর্ধমান দাপটের মুখে টাকার মান ধরে রাখতে গিয়ে সেই তহবিলের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যেই বাজারে ঢালতে হয়েছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ছয়টি প্রথম সারির ব্যাঙ্কের অর্থনীতিবিদ ও ফোরেক্স ট্রেডারদের (forex traders) হিসেব তুলে ধরে এই তথ্য সামনে আনা হয়েছে।

১০০ ছোঁয়ার ভয়

 গত সপ্তাহেই মার্কিন ডলারের নিরিখে ভারতীয় টাকার দাম গড়াতে গড়াতে ৯৬.৯৬ টাকার সর্বকালীন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। মুদ্রা বাজারের কারবারিদের মতে, ডলার পিছু ৯৭ টাকার স্তরটিই এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে অঘোষিত ‘লক্ষ্মণরেখা’ (implicit tolerance threshold)। কারণ এক বার ৯৭ টাকার এই মনস্তাত্ত্বিক বাঁধ ভেঙে গেলে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে এবং ফাটকাবাজদের চাপে টাকার দাম দ্রুত একশোর ঘরও ছুঁয়ে ফেলবে। জাতীয় অর্থনীতির ভাবমূর্তি বাঁচাতে এবং আমদানির খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাই ৯৭ টাকার গণ্ডি ছোঁয়ার আগেই বার বার খোলা বাজারে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। যার জেরে গত সপ্তাহের শেষে টাকা কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৯৪.৮৬ টাকার আশপাশে লেনদেন করেছে।

কীভাবে গড়ে উঠেছিল ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বর্ম

 টাকার ওপর সম্ভাব্য আঘাত আঁচ করে গত জুন মাসেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিদেশি মুদ্রা টানার বিশেষ কৌশল নিয়েছিল। অনাবাসী ভারতীয়দের (NRI) জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল ‘এফসিএনআর-বি’ (FCNR-B) ডিপোজিট উইন্ডো এবং বাড়ানো হয়েছিল সুদের হার। সেই ডাকে প্রত্যাশার চেয়েও বড় সাড়া মেলে। শুধুমাত্র অনাবাসীরাই জমা করেন প্রায় ১২৭ থেকে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যান্য উৎস মিলিয়ে মোট ১৪০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল পুঁজি হাতে আসায় গত ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের মোট বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ৭৮৫ বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল।

 কিন্তু তার পরেই পাশা উল্টে যায়। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ৯৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। লাফিয়ে বাড়ে ভারতের তেল আমদানির বিল। একই সময়ে মার্কিন বন্ডের সুদের হার বাড়ায় ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে এ বছর ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পুঁজি তুলে নিয়েছেন বিদেশি লগ্নিকারীরা (FPIs)। এই সাঁড়াশি চাপেই ৪ সেপ্টেম্বরের পর থেকে মাত্র চার সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভাণ্ডার থেকে উধাও হয়ে যায় প্রায় ৫১ বিলিয়ন ডলার।

ফরোয়ার্ড মার্কেটের বোঝা

 শুধুমাত্র খোলা বাজারে নগদে ডলার বিক্রিই (spot dollar sales) নয়, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অতিরিক্ত সহজলভ্যতার সুবিধে শুষে নিতে ডলার-রুপি সেল-বাই সোয়্যাপ (sell-buy swaps) চুক্তির আশ্রয় নিয়েছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘাড়ে নেট ফরোয়ার্ড ডলার লায়াবিলিটি বা ভবিষ্যতে মেটানোর মতো দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে। ব্রোকারেজ সংস্থা অ্যাম্বিট (Ambit)-এর বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, সোনার ভাণ্ডার (প্রায় ১০৬.৪ বিলিয়ন ডলার) এবং ফরোয়ার্ড মার্কেটের এই বিশাল দায় বাদ দিলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাতে সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নগদ ডলারের পরিমাণ দ্রুত কমছে। এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়েই বাজারে সংশয় তৈরি হতে পারে।

তেলের জন্য বিশেষ জানালা

 সরাসরি ভাণ্ডার ভেঙে ডলার বিক্রির চাপ কমাতে গত সপ্তাহান্তেই প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় প্রাচীর (second line of defence) খাড়া করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বড় তেল বিপণন সংস্থার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে বিশেষ ‘ডলার উইন্ডো’। ফলে তেল কিনতে এই সংস্থাগুলিকে আর খোলা বাজারে এসে ডলারের চাহিদা বাড়াতে হচ্ছে না, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সরাসরি তাদের ডলার জোগাচ্ছে।

 পাশাপাশি মুদ্রা বাজারে ফাটকাবাজি রুখতে ফোরেক্স ডেরিভেটিভ (FX derivatives) লেনদেনে বসানো হয়েছে কড়া মাশুল। ২০ লক্ষ ডলারের বেশি ফরোয়ার্ড চুক্তির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ ঝুঁকি-তহবিল (foreign exchange risk reserve) জমা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৬ অক্টোবর থেকে ব্যাঙ্কগুলির দৈনিক ন্যূনতম ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (CRR) বজায় রাখার সীমা ৯০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯৯ শতাংশ করা হয়েছে এবং ওপেন মার্কেট অপারেশনের মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। নোমুরা-র (Nomura) অর্থনীতিবিদদের মতে, টাকার পতন রুখতে নীতি-নির্ধারকরা যে কতটা মরিয়া, এই কড়া পদক্ষেপগুলি তারই প্রমাণ।