• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 20 October, 2026

বিরাট সস্তা হল সোনা: কলকাতায় দশ দিনে দাম কমল প্রায় ৪ হাজার টাকা, গয়না কেনার এটাই সেরা সময়?

ধনতেরাস ও বিয়ের মরশুমের আগে সস্তা হল সোনা। এমসিএক্স ও কলকাতার বাজারে দশ দিনে প্রায় ৪ হাজার টাকা কমল হলুদ ধাতুর দর। জেনে নিন বাংলার গয়নার বাজারের হালহকিকত।

বিরাট সস্তা হল সোনা: কলকাতায় দশ দিনে দাম কমল প্রায় ৪ হাজার টাকা, গয়না কেনার এটাই সেরা সময়?

Gold prices dip ahead of Diwali: Will the fall continue? (Image: Pexels@Suvranil Dutta)

দুর্গাপুজো শেষ লগ্নে আসতেই কালীপুজো, ধনতেরাস (Dhanteras 2026) এবং অগ্রহায়ণ-মাঘের বিয়ের মরশুমের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে বাংলায়। আর ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণেই মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ও গয়না ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটিয়ে কিছুটা নরম হল সোনার বাজার (gold price dip ahead of Diwali)। মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে (Multi Commodity Exchange-MCX) মঙ্গলবার দশ গ্রাম সোনার দাম ০.৪২ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৩০০ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও স্পট গোল্ডের (spot gold) দর ০.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,১২৮.৯২ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং ডিসেম্বরের মার্কিন গোল্ড ফিউচার্স নেমেছে ৪,১৪৮.৫০ ডলারে। গত দশ দিনের বাজারদর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, কলকাতার বাজারে পাকা ও গয়নার সোনার দাম দশ গ্রামে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে।

 হালকা গয়নার ঝোঁক

কলকাতার বউবাজার, গড়িয়াহাট, সিঁথি ও হাতিবাগান থেকে শুরু করে আসানসোল, দুর্গাপুর, বর্ধমান বা শিলিগুড়ির গয়নার শোরুমগুলিতে গত কয়েক মাস ধরেই চড়া দামের কারণে ক্রেতাদের আনাগোনা ধাক্কা খেয়েছিল। চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেও কলকাতায় ২৪ ক্যারেট পাকা সোনার (24 carat gold rate in Kolkata) দাম দশ গ্রাম পিছু ১ লক্ষ ৫১ হাজার ৪২০ টাকা থেকে ১ লক্ষ ৫৩ হাজার টাকার ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। সেখানে মঙ্গলবার শহরের বাজারে ২৪ ক্যারেট সোনার দর নেমে এসেছে ১ লক্ষ ৪৬ হাজার ৮০ টাকা থেকে ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৭০ টাকার মধ্যে।

 অন্যদিকে বাঙালির বিয়ের গয়না তৈরির প্রধান ভরসা ২২ ক্যারেট হলমার্ক সোনার (22K hallmarked gold) দামও গত দশ দিনে প্রায় চার হাজার টাকা কমে মঙ্গলবার দশ গ্রাম পিছু ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৯১০ টাকা থেকে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৯১০ টাকার আশপাশে ঘোরাঘুরি করেছে। ১৮ ক্যারেট সোনার দশ গ্রামের দর নেমেছে ১ লক্ষ ৯ হাজার ৫৬০ টাকার ঘরে। যদিও ৩ শতাংশ জিএসটি এবং কলকাতার কারিগরদের মজুরি (making charges) যোগ করলে এখনও দশ গ্রাম ২২ ক্যারেট গয়না কিনতে ক্রেতার পকেট থেকে দেড় লক্ষ টাকার বেশিই বেরোচ্ছে। তবুও আগামী ৬ নভেম্বর ধনতেরাস এবং ৮ নভেম্বর দীপাবলির আগে দামের এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে বড় স্বস্তি হিসেবেই দেখছেন বাংলার ক্রেতারা। বউবাজারের স্বর্ণশিল্প মহলের মতে, যাঁদের বাড়িতে অগ্রহায়ণ বা মাঘ মাসে বিয়ে রয়েছে, তাঁরা ভবিষ্যতে দাম ফের বাড়ার আশঙ্কায় এখনই শোরুমে এসে অগ্রিম বুকিং (advance gold booking) সেরে রাখছেন। পাশাপাশি বাজেট সামলাতে ভারী গয়নার বদলে হালকা ওজনের নকশাদার গয়না (lightweight gold jewellery) এবং ১৮ ক্যারেটের গয়নার দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।

সোনা কেন সস্তা হচ্ছে

 অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বে যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে নিরাপদ লগ্নির আশ্রয় হিসেবে সোনার দাম লাফিয়ে বাড়ে। কিন্তু এবার ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। ইয়েমেনের ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি বিদ্রোহীরা সোমবার সৌদি আরবের তেল পরিকাঠামো, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম (Brent Crude oil price) পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছে।

 বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিই ঘুরপথে সোনার দামকে নীচের দিকে টানছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি (inflation concerns) ফের মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর মুদ্রাস্ফীতি রুখতে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সুদের হার কমানোর বদলে তা দীর্ঘ সময় চড়া করে রাখতে বাধ্য হবে। সোনা যেহেতু নিজে থেকে কোনও সুদ দেয় না, তাই বাজারে সুদের হার এবং সরকারি বন্ডের আয়ের হার বাড়লে বড় লগ্নিকারীরা সোনা থেকে পুঁজি সরিয়ে বন্ড ও ডলারে বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে আমেরিকার ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড (US Treasury bond yields) বেড়ে ৫.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ডলার ইনডেক্সও এ বছর ৩ শতাংশের বেশি শক্তিশালী হয়েছে। মূলত এই জোড়া চাপে চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারির ৫,৫৯৫ ডলারের সর্বকালীন শিখর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রায় ২৬ শতাংশ এবং ভারতের বাজারে প্রায় ২৩ শতাংশ সংশোধিত (price correction) হয়েছে।

পতন কি জারি থাকবে

 সোনার দাম আগামী কয়েক দিনে আরও কমবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (US Federal Reserve policy meeting) বৈঠকের ওপর। অক্টোবর মাসের বৈঠকে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম থাকলেও, সিএমই ফেডওয়াচ টুলের (CME FedWatch Tool) পরিসংখ্যান বলছে, আগামী ডিসেম্বরে আমেরিকায় ফের সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৯২ শতাংশ। ফেড কর্তাদের বক্তব্যে যদি দীর্ঘমেয়াদি চড়া সুদের ইঙ্গিত মেলে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আরও কিছুটা চাপে থাকতে পারে।

 তবে ভারতের তথা বাংলার ক্রেতাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পতনের পুরো সুবিধা পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার দুর্বলতা (Rupee vs Dollar exchange rate)। ভারত তার প্রয়োজনের সিংহভাগ সোনাই বিদেশ থেকে আমদানি করে। ডলারের নিরিখে টাকার দাম ৯৫ থেকে ৯৭ টাকার ঘরে ঘোরাফেরা করায় আমদানির খরচ কমছে না। তা ছাড়া মিরে অ্যাসেটের মতো সংস্থার সমীক্ষা বলছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি নিজেদের রিজার্ভ বাড়াতে প্রায় ৭০০ টন সোনা কিনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে সোনার দামকে ফের উপরের দিকে ঠেলে দেবে। ফলে বাজার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ধনতেরাসের আগে সোনার দামে আরও বড় ধসের অপেক্ষায় বসে না থেকে, বর্তমানের এই পতনকে কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে গয়না বুকিং বা গোল্ড ইটিএফে (Gold ETF) লগ্নি সেরে ফেলাই দূরদর্শী পদক্ষেপ হবে।