• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 17 September, 2026

ডিজিটাল ফ্রড— বাঁচুন ও বাঁচান: এক সহজপাঠ

আসলে, ঠিক ওই সময়টায় অনেকেরই মাথা ঠিকঠাক কাজ করে না। বিশেষত সিনিয়র সিটিজেনদের ক্ষেত্রে, কারণ তাঁরা এখনও ঠিক সেই অর্থে টেক-স্যাভি নন।

ডিজিটাল ফ্রড— বাঁচুন ও বাঁচান: এক সহজপাঠ

Fraud Call MLA;s Photo-Representative

সুমন্ত চক্রবর্ত্তী

• হ্যালো, অমুক বলছেন?
• হ্যাঁ বলছি।
• আপনার XYZ ব্যাঙ্ক থেকে বলছি৷ আপনার ⁠KYCটা আপডেট করতে হবে। একটু আধার কার্ড নম্বরটা বলুন।
পাঠক, আপনাদের কতজন প্রতি মাসে একবার করে অন্তত এই ধরনের কল পান এখন? সবাই, তাই তো?
ডিজিটাল ফ্রড। বিগত কয়েক বছরে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ব্যবহারে যেমন উন্নত হয়েছে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, সঙ্গে সঙ্গে ঠিক ততটাই বেড়েছে ডিজিটাল ফ্রড। আসলে, চাঁদেরও তো কলঙ্ক থাকে৷

ফোন করে ভয় দেখানোটা না হয় এখন একটু পুরনো হয়ে গেছে— কিন্তু তৈরি হয়েছে আরও অনেক ঠকানোর মাধ্যম। প্রতিদিন বিভিন্ন রকমের মেইল আমরা সবাই পাই, যার বেশির ভাগই জাঙ্ক মেইল বা অ্যাডভার্টাইজিং মেইল। এর মাঝেই আবার লুকিয়ে থাকে ভয় ধরানো মেইল। কীরকম?

ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে আসা দশ বছরের পুরনো ট্যাক্স পেনাল্টির চিঠি, জিএসটি দপ্তর থেকে আসা কয়েক লাখ বা কোটি টাকার ক্লেম, বিভিন্ন সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের নাম করে ‘আপনি কপিরাইট অমান্য করেছেন’ তাই অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করে দেওয়ার নোটিশ— এসব তো আছেই। সঙ্গে এখন শুরু হয়েছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। সেটা কী? ভিডিও কল করা হবে আপনাকে—ফোনের উল্টোদিকে দেখবেন সাজানো গোছানো কোনও অফিস চেয়ারে বসে আছেন উর্দি পরিহিত পুলিশ বা কোনও কাস্টমস অফিসার। দেখিয়ে দিতে হবে ক্যামেরায় যে আপনি ঘরে একাই আছেন। এমন ভয় দেখানো হবে যে, সাধারণ মানুষ ঘাবড়ে যেতে বাধ্য। বিনিময়ে বলা হবে— এই অ্যাকাউন্টে এত টাকা পাঠিয়ে দিন, তবেই ক্লিন চিট দেওয়া হবে।

তো এর থেকে বাঁচবেন কীভাবে? সরকার বা আরবিআই (RBI)-এর পক্ষ থেকে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সব রকমের অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রচার করা হচ্ছে টিভি, এফএম এবং সমাজমাধ্যমে। তবুও ফাঁদে পড়ছেন অনেকেই। ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল-এর তথ্য অনুযায়ী, শেষ দুই অর্থবর্ষে প্রায় ৬০ লাখ লোক সারা দেশ জুড়ে এর শিকার হয়েছেন। জলাঞ্জলি গেছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা শুধুমাত্র ডিজিটাল ফ্রডে। ভাবুন— আমাদের কষ্টার্জিত টাকা চলে গেছে প্রতারকদের কাছে মুহূর্তের অসাবধানতায় বা বোকামির জন্য।

আসলে, ঠিক ওই সময়টায় অনেকেরই মাথা ঠিকঠাক কাজ করে না। বিশেষত সিনিয়র সিটিজেনদের ক্ষেত্রে, কারণ তাঁরা এখনও ঠিক সেই অর্থে টেক-স্যাভি নন। মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, সমাজমাধ্যম বা মেইল ব্যবহারে তাঁদের মধ্যে কিছুটা জড়তা আছে, যা থাকা খুব স্বাভাবিক। আমরা বা আমাদের ছেলেমেয়েরা ছোট থেকে এসব ব্যবহার করে অভ্যস্ত হলেও, তাঁদের জীবনের সিংহভাগ সময় এসব ছাড়াই কেটেছে। তাই এই বয়সে তাঁদের একটু জড়তা থাকা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু শুধু তাঁরাই নন, কম বয়সীরাও একইভাবে জড়িয়ে পড়ছেন এই প্রতারণার জালে। আর প্রতিদিন যেমন উন্নত হচ্ছে প্রযুক্তি, আবিষ্কার হচ্ছে ফ্রডের ও নতুন নতুন পদ্ধতি।

তাহলে উপায়? কিছু সহজ টিপস দেওয়ার চেষ্টা করা হলো এই লেখায়, যেগুলো যে কোনও লোক খুব সহজেই মেনে চলতে পারেন।
১. ব্যাঙ্ক থেকে KYC আপডেট করতে ফোন করলে শুধু একটা কথাই বলুন— ‘আমি ব্যাঙ্কে গিয়ে করে নেব।’ বাড়ির মা-বাবাদেরও শিখিয়ে দিন শুধু এইটুকু বলে ফোন কেটে দিতে। ফোন না কাটলে কিন্তু প্রতারকরা কথার জালে জড়িয়ে ফেলবেন যে কোনও সময়৷
২. কোনও ভয় ধরানো মেইল এলে আগে প্রেরকের (Sender) নাম ভালো করে দেখুন। ডিসপ্লে নাম যাই থাক, তার ওপর আঙুল দিয়ে সিলেক্ট করলে আসল মেইল অ্যাড্রেসটা দেখতে পাবেন। ওটা যদি কোনও পরিচিত অথরাইজড ডোমেইন (যেমন @gmail.com, @yahoo.com ইত‍্যাদি অথবা কোম্পানির নাম দেওয়া ডোমেইন নেম) না হয়, তবে ডিলিট করে দিন। ডিসপ্লের নাম দেখে ঘাবড়াবেন না।
৩. অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল ধরবেন না। বাড়ির বড়দেরও বলে দিন সব কল ধরার দরকার নেই। যিনি কল করছেন, তাঁকে আগে টেক্সট করে পরিচয় দিতে বলুন, আপনার চেনা লোক হলে তখন ধরবেন।
৪. ফোনে কলার ডিরেক্টরি অ্যাপ ইনস্টল করে রাখুন। এতে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে আগেভাগেই বোঝা যায় সেটা স্প্যাম বা প্রমোশনাল কল কি না।
৫. মনে রাখবেন, টাকা রিসিভ করার জন্য কোনও পিন (PIN) লাগে না। কেউ যদি এই প্রলোভন দেখিয়ে পিন জানতে চায়, সবিনয়ে বলুন ‘আমার টাকা লাগবে না।’
৬. পাবলিক প্লেসের বারোয়ারি ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) থেকে অ্যাকাউন্টে টাকার আদান-প্রদান করা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।
৭. মিউল অ্যাকাউন্ট (Mule Account) সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করে রাখুন। সোজা বাংলায়— নিজের অ্যাকাউন্ট কাউকে ভাড়া দেবেন না। প্রতারকরা সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা নেয় না। তারা গরিব বা বয়স্ক লোকেদের অ্যাকাউন্ট টার্গেট করে এবং অর্থের বিনিময়ে সেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। আপনার ভাড়া দেওয়া অ্যাকাউন্টকে হাতিয়ার করে প্রতারকরা কোটি কোটি টাকা হাতবদল করে ফেলে মুহূর্তের মধ্যে। তখন কিন্তু ফেঁসে যাবেন আপনি, কারণ পুলিশের খাতায় আপনার নামটাই আগে আসবে।
৮. শেষ এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ—ভুলেও কোনও লিঙ্কে তাড়াহুড়ো করে ক্লিক করবেন না, যতক্ষণ না সেই লিঙ্কটি যে পাঠাচ্ছে তার পরিচয় সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হচ্ছেন।
মেনে চলার চেষ্টা করুন। আর তারপরেও যদি কিছু হয়ে যায়, সময় নষ্ট না করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা কার্ড সঙ্গে সঙ্গে ব্লক করবেন এবং সাইবার ক্রাইম পোর্টালে (হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০) লিখিত অভিযোগ জানান। সবশেষে, মাথা ঠান্ডা রাখবেন। ভয় পাবেন না— ভয়ই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু
আর প্রতারকদের প্রতারণার চাবিকাঠি। ভালো থাকুন। গচ্ছিত টাকা নিরাপদে রাখুন।
(প্রাক্তন সিনিয়ার ব্যাঙ্কার, বর্তমানে ব্যাঙ্কিং উপদেষ্টা প্রশিক্ষক)৷