নির্মল ধর
গত কয়েক বছর ধরেই ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ ছবির নামে টালিগঞ্জের পরিভাষায় গাঁয়ে-গঞ্জে লুকিয়ে চুরিয়ে কলাকুশলীর সংস্থা ফেডারেশনের নজর এড়িয়ে ‘গুপি’ মার্কা বেশ কিছু ছবি নাকি তৈরি হয় এবং ফেলে আসা বছরটাতেও হয়েছে। সেসব ছবির হদিশ আমরা অনেকেই পাই না। সেগুলো বাদ দিলে শহরের সিঙ্গল স্ক্রিন ও মাল্টিপ্লেক্সে ‘স্বাভাবিক’ভাবে প্রচারের আলো জ্বালিয়ে মুক্তি পাওয়া ছবির সংখ্যা কমবেশি ষাটটির কাছাকাছি। সংখ্যার নিরিখে নিশ্চিতভাবে তেমন আশাব্যঞ্জক নয় ঠিকই, কিন্তু মুক্তি পাওয়া ছবিগুলির মধ্যে অন্তত কুড়ি-বাইশটি ছবি বক্স অফিসের আনুকূল্য পেয়েছে। যদিও সেই ‘আনুকূল্য’ বা জনপ্রিয়তা কিছু ক্ষেত্রে লোকদেখানো।
Advertisement
তবুও বছরের প্রথম মাসে সৃজিত মুখার্জির ‘সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই’ ছবিটি পুরনো ইংরেজি ও হিন্দি ছবির নব সংস্করণ হলেও সিনেমা প্রকরণের পারিপাট্যে যেমন, তেমনই তারকাখচিত অনসম্বল কাস্টিংয়ের উজ্বলতায় চোখ ও মন কেড়েছিল। পরের মাসে এসেছিল দু’টি মনে রাখার মত ছবি— আদিত্য বিক্রম দত্তর ‘মায়ানগর’ এবং কলকাতার তরুণ অভিজিৎ চৌধুরীর প্রথম ছবি ‘ধ্রুবর আশ্চর্য জীবন’। আদিত্যর ছবি নিকট অতীত কলকাতার এক ধূসর ও বাস্তব চিত্র তুলে আনে ইম্প্রেশনিস্টিক স্টাইলে। আদিত্যর সিনেমা ব্যাকরণে আধুনিক ভাবনার প্রকাশ ভালো লেগেছিল। আর ধ্রুবর ছবিতে দর্শক পেয়েছিলেন তারুণ্যের সাহস ও পরীক্ষার সুষম ফসল। মার্চ মাসের একমাত্র প্রাপ্তি তরুণী ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীর ‘ছাদ’। এক উঠতি লেখিকা তাঁর বাড়ির একান্ত করে পাওয়া ছাদটি অকস্মাৎ হারিয়ে ফেললে তার যে মানসিক শূ্ন্যতা সৃষ্টি হয়, তাকেই সিনেমার সরল ন্যারেটিভে সুন্দর তুলে এনেছিলেন। এপ্রিলে এলো সৃজিতের দ্বিতীয় ছবি ‘কিলবিল সোসাইটি’।
Advertisement
কমেডির মোড়কে অ্যাকশন ও প্রেমকে জারিত করে দর্শককে চমকে দেন সৃজিত। এই ছবিতে বাড়তি পাওনা ছিল পরমব্রত এবং উঠতি নায়িকা কৌশানীর যুগ্ম অভিনয়। মে মাসের পাঁচটি ছবির মধ্যে জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের ‘একেন: বেনারসে বিভীষিকা’ মাঝারি মানের ছবি হয়েও দর্শকমন জয় করে একমাত্র অনির্বাণ চক্রবর্তীর জন্যই। সৌরভ পালধির ‘অঙ্ক কি কঠিন’ মাঝারি মাপের হিট হল ছবির নতুন বিষয় এবং উপস্থাপনার সরল ভঙ্গিতে। শিবু-নন্দিতা জুটির ‘আমার বস’ রাখীর উপস্থিতির চমক নিয়েও কিন্তু সুপার হিট হয়নি। একই ব্যাপার ঘটেছে ‘রক্তবীজ ২’-এর ক্ষেত্রেও। অত্যন্ত দুর্বল কাহিনী-চিত্রনাট্য এবং আবিশ্বাস্য অবাস্তব সমাপ্তি ছবির। জুন মাসে সবচাইতে বেশি ছবি মুক্তি পায়। সংখ্যাটা ৯। সঙ্গীতকার থেকে পরিচালনায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘কেদারা’র মতো ‘কঠিন’ ছবি বানিয়ে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত ‘গৃহপ্রবেশ’-এর মতো পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক জীবনের বক্তব্য নিয়ে পারিবারিক ঘরানার ‘গৃহপ্রবেশ’ বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। এই ছবিতে শুভশ্রীর অভিনয় সবার নজর কাড়ে। সৌকর্য ঘোষালের ‘পক্ষীরাজের ডিম’ রূপকথা ও আধুনিক জীবনের মিশেলে এক মনোহারি ছবি। রাজা ঘোষের ‘চাবিওয়ালা’ সম্ভাবনা জাগিয়েও উজ্জল হয়ে উঠতে পারেনি।
জুলাই মাসে আমরা দু’টি ভিন্ন স্বাদ ও রুচির ছবি পাই। অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী দীর্ঘ সময় মু্ম্বইয়ে কাটিয়েও তিনি যে ‘মুম্বইকর’ হয়ে যাননি, তা প্রমাণিত হল ‘ডিয়ার মা’ ছবি বানানোয়। মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ডিং (দত্তক হলেও) মাতৃত্বের স্বাদ ও সম্পর্কে কোনও দাগ ফেলে না। সিনেমার ভাষায় এবং আন্তরিক উপস্থাপনায় ছবিটি শহুরে দর্শকের মন জয় করেছিল। আবার ইন্দ্রাশিস আচার্যের পাঁচ নম্বর ছবি ‘গুডবাই মাউন্টেন’ দু’টি মানুষের দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে দেখা হওয়ার ছবি। কিন্তু সেখানেও অকৃত্রিম নির্জনতা ও পাহাড়ের কোলে তাদের ক’টা দিন কাটানোও মসৃণভাবে কাটে না। গভীর ইন্ট্রোস্পেকটিভ ছবি।
আগস্ট এলো, প্রায় একই সঙ্গে ‘ধূমকেতু’, ‘রঘু ডাকাত’, ‘রক্তবীজ’ আর ‘দেবী চৌধুরানী’ পুজোর রোশনাইয়ের এই চারটি ছবির প্রচারেই রোশনাইও হার মেনেছিল। বাজারে গুজব ছিল, এইসব ছবির প্রযোজকরাই নাকি গোছা গোছা টিকিট কিনে সাজানো ‘হাউসফুল’ বোর্ড ঝুলিয়ে ছবিগুলোর গলায় হিট বা সুপার হিট লকেট ঝুলিয়েছিলেন। তবে এটা তো বাস্তব সত্যি, পুজোর বাজনা বাজার পর আর কোনও ছবিকেই শহরের বড় পর্দায় দেখা যায়নি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম জনপ্রিয় রচনা নিয়ে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ দর্শকের কাছে পেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সেপ্টেম্বরে মাত্র একটি বাংলা ছবি ‘অহনা’ মুক্তি পায়। প্রমিতা ভৌমিকের প্রথম ছবিও তেমন উল্লেখ করার মতো নয়। অক্টোবরে অন্নপূর্ণা বসুর প্রথম ছবি ‘স্বার্থপর’ টালিগঞ্জের জনপ্রিয় কোয়েল মল্লিককে প্রথম একটি চিত্রনাট্যের ব্যাকিং পাওয়া চরিত্র দিয়েছিল। তিনি নিশ্চয়ই তাঁর সেরা পরিশ্রমটি ইনভেন্ট করেছেন, কিন্তু ডিভিডেন্ট পাননি।
বছর শেষের আগের মাসে প্রায় ‘গুপি’ ফর্মুলায় ফিল্মস্কুল ছাত্রদের তৈরি ‘একাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ কলাকুশলী ফেডারেশনের সঙ্গে বিরোধ ঘটিয়ে প্রচারের ‘বাদ্যি’ বাজিয়ে প্রথম সপ্তাহে ‘হাউসফুল’ পেল। কিন্তু পরের সপ্তাহ থেকে ছবির বীভৎস অ্যাকশন দৃশ্য আর অপভ্রংশ শব্দের ফুলঝুরির আগুন থেকে বাঙালি দর্শক সরে আসায় ‘হিট’ তকমাও লাগল না ছবির কপালে। বরং জাতীয় পুরস্কার জেতা অর্জুন দত্তর ‘ডিপ ফ্রিজ’ ফিল্মবোদ্ধা দর্শকের সঙ্গে পরিচ্ছন্ন সিনেমার মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রায় ‘হিট’ করিয়ে দিল। আবির ও তনুশ্রী চক্রবর্তীর অভিনয় চোখ টানল দর্শকের। প্রতীম দাশগুপ্তের ‘রান্নাবাটি’ সঠিক মশলা এবং রাঁধুনির হাতের গুণে সুস্বাদু ‘মাছের ঝোল’ হয়ে উঠল না।
আর বছরের শেষ মাসে আবার ফিরে এলেন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় একই বছরে তাঁর তিন নম্বর ছবি ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ নিয়ে। যে ছবি নিয়ে তিনি প্রস্ততি ও নির্মাণ পর্বে দীর্ঘ সময়ও নিয়েছেন। প্রচারেও ঘাটতি রাখেননি ছবির নির্মাতা দুই সংস্থা। এখনও পর্যন্ত সৃজিতের এই ছবি একই দিনে রিলিজ হওয়া অভিজিৎ সেনের ‘প্রজাপতি ২’ থেকে দর্শকানুকূল্যে অনেকটাই পিছিয়ে। তবে এটাও সত্যি সৃজিত নিজের দর্শকদের আনুকূল্য পাচ্ছেন। চৈতন্যদেবের অন্তর্ধান রহস্যে নতুন কোনও আলোকপাত করতে পারেনি তাঁর ছবি, নির্মাণশৈলী ও প্রকরণে সৃজিতের ‘ছাপ’ অবশ্যই আছে। আর বেঙ্গল টকিজ তার অতীতের রেকর্ড বজায় রেখেই দেব-মিঠুনের (পুত্র-পিতার) নাটুকে রসায়নকে কমেডি আর আবেগের ভিয়েনে চড়িয়ে— সাফল্যের সমুদ্রে ভালোই সাঁতার কাটছে। যার ধারেকাছেও কিন্তু যেতে পারেনি অতীতের একাধিক সুপারহিট মেকার অরিন্দম শীলের ‘মিতিন: এক খুনির সন্ধানে’। ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে…’ ধরনের সংলাপটি প্রজ্ঞাপারমিতা ওরফে শখের গোয়েন্দা মিতিনের ঠোঁটে ঢুকিয়ে দিলেও দু’টির কোনও কাজেই দেখা গেল না!
ফেলে আসা বছরটায় আরও দু’টি যুগান্তকারী ঘটনা— এক, কলাকুশলী ফেডারেশনের রাজনৈতিক সাফল্যের প্রদর্শনী। দুই, বাংলা সিনেমা রিলিজ নিয়ে টালিগঞ্জের শিল্প ব্যবসায়ী ও ফেডারেশনের সমন্বয়ে স্ক্রিনিং কমিটির জন্ম, যাদের সঙ্গে স্বাধীন প্রযোজকদের কোনও সম্পর্ক নেই। দেখা যাক, নতুন বছর কোন স্বপ্নের ছবি আনে!
Advertisement



