আজ প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তিনি এমন এক নাম, যাঁর অবদান শুধুমাত্র কয়েকটি সফল চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বাংলা চলচ্চিত্রের ভাষা, ভাবনা এবং উপস্থাপনাকে নতুন মাত্রা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। এই বিশেষ দিনে তাঁকে স্মরণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঋতুপর্ণ ঘোষের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি বাংলা সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র জগতে পরিচালকের অসামান্য অবদানের কথা তুলে ধরেছেন।
সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের পর বাংলা সিনেমার যে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর সিনেমা নতুন করে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছিল। একদিকে যেমন তিনি মধ্যবিত্ত বাঙালির পারিবারিক সম্পর্ক, আবেগ এবং সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে বাংলা সিনেমাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।
Advertisement
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উনিশে এপ্রিল’ তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। এই ছবির মাধ্যমে তিনি জাতীয় স্তরে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এরপর একে একে ‘দহন’, ‘অসুখ’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘উৎসব’, ‘চোখের বালি’, ‘রেনকোট’, ‘দোসর’, ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, ‘আবহমান’, ‘নৌকাডুবি’ এবং ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো একাধিক উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর প্রতিটি ছবিতেই মানবসম্পর্ক, মানসিক টানাপোড়েন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন উঠে এসেছে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে।
Advertisement
ঋতুপর্ণ ঘোষের কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নারী চরিত্রের অসাধারণ উপস্থাপনা। তাঁর ছবির নারীরা কখনও শুধুমাত্র সহায়ক চরিত্র হয়ে থাকেনি; বরং গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। নারী মনের জটিলতা, স্বাধীনতা, আত্মসম্মান, প্রেম, ক্ষোভ এবং সংগ্রামকে তিনি যে গভীরতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বাংলা সিনেমায় বিরল। বহু চলচ্চিত্র সমালোচকের মতে, নারীর মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন এক অনন্য স্রষ্টা।
তবে তাঁর অবদান শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় লেখক এবং দক্ষ সঞ্চালকও। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কলাম ‘ফার্স্ট পার্সন’ পাঠকমহলে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং সমকালীন নানা বিষয় নিয়ে তাঁর লেখাগুলি পাঠকদের ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর লেখনী ছিল যেমন গভীর, তেমনই সহজবোধ্য। ফলে লেখক হিসেবেও তিনি সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন।
সমাজের নানা বিষয়ে স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করতেও কখনও পিছপা হননি ঋতুপর্ণ ঘোষ। লিঙ্গ পরিচয়, সামাজিক বৈষম্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মানবিক অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং শিল্পচর্চা বহু মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছিলেন। পাশাপাশি নিজের সত্তাকেও সকলের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। সমকাম বিষয়টি নিয়ে সমাজের যে এক অস্পৃশ্যতা রয়েছে তাকে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ‘চিত্রাঙ্গদা’ সিনেমার মাধ্যমে তা নিয়ে এসেছিলেন সকলের সামনে। বুঝিয়েছিলেন ভালোবাসার কোনো লিঙ্গ হয় না।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-সহ অসংখ্য সম্মান ও স্বীকৃতি তাঁর ঝুলিতে এসেছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। আজও নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা তাঁর সিনেমা দেখে মুগ্ধ হন। ২০১৩ সালের ৩০ মে তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ বাংলা সংস্কৃতি জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি কখনও হারিয়ে যায় না। তাঁর সেই সৃষ্টি আজও রয়ে গিয়েছে দর্শকদের মনে।
Advertisement



