আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যাচাই প্রক্রিয়ার পর শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা। আর সেই তালিকাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর আরও প্রায় ১৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে খসড়া তালিকার তুলনায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার নাম বাদ পড়েছিল। নতুন করে বাদ পড়া ১৪ লক্ষ যুক্ত হলে মোট সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৭৭ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যাটা ৯০ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে।
Advertisement
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ অর্থাৎ তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে প্রায় ৬০ লক্ষ আবেদন ঝুলে ছিল। তার মধ্যে ৩১ লক্ষ নাম যাচাই করে সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই ৩১ লক্ষের মধ্যে প্রায় ১৪ লক্ষ অর্থাৎ ৪৪ শতাংশেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে। একই প্রবণতা বজায় থাকলে বাকি ২৯ লক্ষ আবেদন থেকেও আরও প্রায় ১৩ লক্ষ নাম বাদ পড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
Advertisement
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সংখ্যালঘু ভোটারদের সংখ্যা নিয়ে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় সংখ্যালঘু জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও ভোটারের হিসাবে তা প্রায় ২৭.৫ শতাংশ। তবে সংশোধন প্রক্রিয়ার ফলে এই হার ২ থেকে ৩ শতাংশ কমে ২৪.৫–২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
যদিও নির্বাচন কমিশন কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করেনি, তবুও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি— খসড়া তালিকা প্রকাশের সময়ই প্রায় ১৮ লক্ষ সংখ্যালঘু ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির সংখ্যা বেশি হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যালঘু ভোট কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের উপর। কারণ এই ভোটব্যাঙ্কে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে, এর ফলে বিরোধী দল বিশেষত বিজেপি কিছুটা সুবিধা পেতে পারে বলেও মত অনেকের।
তবে এর প্রভাব সব এলাকায় সমান হবে না। যেখানে সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে প্রভাব কম হতে পারে। কিন্তু মিশ্র জনসংখ্যার এলাকায়—যেখানে সংখ্যালঘু ভোট ১৫–২০ শতাংশ—সেখানে ফলাফলে বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, এসআইআর প্রক্রিয়ার ফলে ভোটারদের মধ্যে একধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকের ধারণা, ভোট না দিলে ভবিষ্যতে নাম বাদ পড়তে পারে। ফলে গ্রাম থেকে শহর— সব জায়গাতেই ভোটদানের হার বাড়তে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলে আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে।
এদিকে দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার মাখালগাছা, হাসনাবাদ, গাইঘাটা-সহ একাধিক এলাকায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন সাধারণ মানুষ। কোথাও টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ, কোথাও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ—পরিস্থিতি বেশ কয়েক জায়গায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জানা গিয়েছে, মাখালগাছা এলাকায় দুটি বুথ থেকেই প্রায় ৬৫০ জনের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। গ্রামবাসীরা হাবাসপুর ব্রিজের সামনে অবরোধ শুরু করেন, যার ফলে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিংয়ে ভোটাধিকার রক্ষা মঞ্চের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশ-প্রদর্শনকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার চাঁদপাড়ায় একটি বুথে ১৮৬ জনের মধ্যে ১৮৩ জনের নাম বাদ পড়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যে উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর—সবই একসঙ্গে বাড়ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ইস্যুর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে ভোটের ফল প্রকাশের পরেই।
Advertisement



