• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 12 July, 2026

আজ বিশ্ব কবিতা দিবস

প্রদীপ কুমার চৌধুরী ইউনেস্কো, ইতিমধ্যে বছরে ৩৬৫ দিনের অধিকাংশই কোনও না কোনও দিবস হিসেবে ধার্য করেছে৷ যেমন— বিশ্ব খাদ্য দিবস, বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস, বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস, বিশ্ব নারী দিবস ইত্যাদি৷ কিন্ত্ত ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কবিতার জন্য কোনও নির্দিষ্ট দিবস ধার্য ছিল না৷ এই কবিতা দিবস ধার্য না হওয়া নিয়েই ছিল আমাদের (আমরা যারা কবিতা

আজ বিশ্ব কবিতা দিবস

প্রদীপ কুমার চৌধুরী

ইউনেস্কো, ইতিমধ্যে বছরে ৩৬৫ দিনের অধিকাংশই কোনও না কোনও দিবস হিসেবে ধার্য করেছে৷ যেমন— বিশ্ব খাদ্য দিবস, বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস, বিশ্ব প্রবীণ নাগরিক দিবস, বিশ্ব নারী দিবস ইত্যাদি৷ কিন্ত্ত ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কবিতার জন্য কোনও নির্দিষ্ট দিবস ধার্য ছিল না৷

এই কবিতা দিবস ধার্য না হওয়া নিয়েই ছিল আমাদের (আমরা যারা কবিতা লিখি, কবিতা ভালোবাসি, কবিতা চর্চা করি…) ক্ষোভ, আপত্তি এবং কবিতা দিবস ধার্য করার আন্দোলন৷ আনুমানিক ১৯৮৫-৮৬ সালে কবিতাপ্রেমী একঝাঁক কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আলোচনায় উঠে আসত— ‘কবিতার জন্য কোনও দিবস ধার্য নেই কেন?’ কবিতার প্রতি এই তাচ্ছিল্য, একজন কবিতাপ্রেমী হিসেবে আমাকে তো পলে পলে বিদ্ধ করত৷ আমি প্রশ্ন করেছিলাম, সুনীলদা (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)সহ অনেক অগ্রজ কবি-সাহিত্যিককে৷

সুনীলদাও এক কথায় স্বীকার করেছিলেন যে, ইউনেস্কোরও উচিত কবিতার জন্য একটি দিবস ধার্য করা৷
প্রশ্ন হল, এই কঠিন কাজটি কীভাবে হবে? বেশ কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও এই ব্যাপারে তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি৷ ইতিমধ্যে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসূত্রে অনেকবার আমাকে জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপ যেতে হয়েছিল৷ সেখানে কাজের ফাঁকে বিদেশি কবিবন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হতে থাকল এবং কবিতা দিবসের ব্যাপারে খোঁজ নিতে শুরু করলাম৷ উল্লেখ করা যেতে পারে, সেই সময় বিদেশের বহু নামি সাহিত্য পত্রিকায় আমার ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হচ্ছিল ধারাবাহিকভাবে৷ ইউনেস্কোর সদর দফতর থেকে জানতে পারলাম, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে কোনও আবেদন বা প্রতিবাদপত্র গ্রাহ্য হয় না৷ এরজন্য প্রয়োজন ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি অ্যাসোসিয়েশন (ফোইপা)-এর মাধ্যম৷ সুতরাং যেতে হল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যে অবস্থিত ফোইপার প্রধান কার্যালয়ে৷ এখানে পেঁৗছে আরও অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান পেলাম৷ কোনও দেশের কবি-সাহিত্যিককে ব্যক্তিগতভাবে ফোইপার সদস্যপদ দেওয়া হয় না৷ একমাত্র সে দেশের সরকারি রেজিস্ট্রিকৃত সংস্থাকেই ফোইপার সদস্যপদ দেওয়া যেতে পারে যদি সেই সংস্থা ফোইপার শর্তাবলী পূরণ করে আবেদন করে৷

প্রায় দশ বছর অতিক্রান্ত৷ ১৯৯৬ সালে পোয়েটস ফাউন্ডেশন গঠিত হল৷ ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজসেবা সংস্থা পোয়েটস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার হিসেবে ফোইপার সদস্যপদ পেয়ে জানতে পারলাম, ফোইপার গভর্নিং বডির সদস্য নির্বাচিত না হতে পারলে ইউনেস্কোতে ভারতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব করার জায়গায় পেঁৗছতে পারব না৷ সেই সময় সারা পৃথিবীতে ইউনেস্কোর সদস্য দেশের সংখ্যা ছিল ১৯৮টি৷ ভারতবর্ষের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোনও দেশের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ বা এরকম দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল৷ নির্বাচনে জয়লাভ প্রায় অসম্ভব জেনেও বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে লাগলাম৷ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যথা আফ্রিকার দেশসমূহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ, লাতিন আমেরিকার কিছু দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলাম, কবিতাসূত্রে যাঁদের সঙ্গে পূর্ব পরিচয় ছিল৷ সেবার আমাকে প্রায় একমাস আমেরিকার শিকাগো এবং নিউজার্সি-নিউইয়র্কে থাকতে হয়েছিল৷ ‘শেষ দেখে ছাড়ব’— এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে নির্বাচনের প্রস্ত্ততিপর্ব পর্যন্ত দেখে এসেছিলাম৷ হার মেনে নেব বলে মনে মনে তৈরিও ছিলাম৷ কিন্ত্ত নির্বাচনের ফলাফল সব হিসেবে উল্টে দিল৷ অপ্রত্যাশিত জয়ের স্বাদ পেলাম৷ ভারতবর্ষ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি পোয়েটস ফাউন্ডেশনের কর্ণধার হিসেবে প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী ফোইপার গভর্নিং বডিতে সদস্যপদে ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হল৷ সে এক অনাবিল আনন্দ৷ গভর্নিং বডির ছয় সদস্য দেশগুলি ছিল— ইউএসএ, ইউকে, ফ্রান্স, রাশিয়া, বেলজিয়াম ও ভারতবর্ষ৷

তারপর ফেইপার গভর্নিং বডির সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে একযোগে ইউনেস্কোতে আবেদন ও দরবার৷ ফলস্বরূপ ইউনেস্কোর ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ২১ মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ ঘোষণা৷ সেই সংবাদের বিস্তৃত বিবরণ আমাদের হাতে আসে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে৷ সঙ্গে সঙ্গে আমি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে কলকাতার সমস্ত প্রথম শ্রেণির দৈনিক সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে এই বিশেষ খবরটি জানাই৷ এই খবর কলকাতার বেশ কয়েকটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছিল৷

সেই থেকে আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষ ও উপমহাদেশে ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ উদযাপনের প্রথম এবং পথ প্রদর্শক সংস্থা হিসেবে পোয়েটস ফাউন্ডেশন অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে আসছে৷ ২০০০ সালের ২১ মার্চ ভারতবর্ষে প্রথম ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ উদযাপন হয়েছিল কলকাতার পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাগৃহে পোয়েটস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে৷ সেদিনের অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি দফতরের মন্ত্রী ড. প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, রাজ্যের দমকল মন্ত্রী প্রতীম চট্টোপাধ্যায়, কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ড. পবিত্র সরকার, কবি-সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ৷ সেদিনের অনুষ্ঠান কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ বহু দর্শকের উপচে পড়া সমাগমে পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল৷

ইউনেস্কো তাদের বার্তায় জানিয়েছিল, ২১ মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ এবং একই সঙ্গে ‘জাতিবৈষম্য দূরীকরণ দিবস’ও৷ তাই একই দিনে দুটি বিষয়ে যৌথ উদযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে সারা পৃথিবীতে৷ এতে কবিদের কবিতা, কাব্যরসিক ও পদ্য আন্দোলন যে শুধু জনপ্রিয় হচ্ছে তাই নয়, রীতিমতো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে৷ ইউনেস্কো প্রত্যেক সদস্য দেশকে ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ নিজস্ব প্রথায় পালনের অনুরোধ জানিয়েছে৷ এই ব্যাপারে ভারতবর্ষ ও উপমহাদেশে ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ উদযাপনের প্রথম সংস্থা হিসেবে পোয়েটস ফাউন্ডেশনও সবাইকে (বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পৌর প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য, সমাজসেবা সংস্থা ইত্যাদি) প্রতি বছর ২১ মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ পালনের আহ্বান জানাচ্ছে৷ এই প্রসঙ্গে জানাই, ইউনেস্কোর বার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০০১ সাল থেকে দেশ-বিদেশে অবস্থিত পোয়েটস ফাউন্ডেশনের শিকাগো, ঢাকা, জম্মু, লন্ডন, গ্যাংটক, দিল্লি প্রভৃতি কেন্দ্রে ২১ মার্চ ‘বিশ্ব কবিতা দিবস’ উদযাপনে অংশগ্রহণ করে কবিতা আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নেবার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷

এই তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি আমরা কবিতা পাঠ, কবিতার আবৃত্তি, কবিতার গান, কবিতার বই প্রকাশ, আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে কবিতার সুনির্দিষ্ট অবস্থানটি নিশ্চিত করতে চাই৷

আজ সারা বিশ্বের বহু দেশে দেশে যুদ্ধ৷ সেই দেশগুলো মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানিতে জর্জরিত৷ যুদ্ধ যেন লেগেই আছে৷ দু’বছর অতিক্রান্ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও চলছে৷ নতুন করে প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল যুদ্ধ লেগেছে৷ থামবার কোনও লক্ষণ নেই৷ তাই এই পৃথিবীতে একমাত্র কবিতাই বিশ্বশান্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে মনে করি৷ এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস৷ কবিতার জয় হোক৷