• facebook
  • twitter
Tuesday, 24 March, 2026

মাঝরাতে অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ নিয়ে বিজেপি-কমিশনকে নিশানা মমতার

বাম-ডান ভুলে কমিশনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোটের আহ্বান মমতার

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

মাঝরাতে অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা নিয়ে ফের ফুঁসে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গভীর রাতে তালিকা কেন প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর পিছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলাম বলেই ক’জনের নাম উঠেছে।‘

সোমবার বেশি রাতে এসআইআরের তালিকা প্রকাশ নিয়ে মমতা বলেন, ‘তালিকা বার করতে এত ভয় কেন? তা হলে কি তালিকায় স্বচ্ছতা নেই? কেন মধ্যরাতে তালিকা প্রকাশ করা হল? বিচারকেরা তো ছ’দিন আগে কাজ শেষ করে দিয়েছিলেন। তার পরেও দেরি কেন? এক তরফা কোনও পার্টির নাম ঢুকিয়েছেন?’

Advertisement

বিধানসভা ভোটের প্রচারের জন্য মঙ্গলবার দুপুরে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে রওনা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে ফের তিনি সরকারি আমলা ও আধিকারিকদের বদলি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনৈতিক ভাবে ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মমতা। নন্দীগ্রামের বিডিওকে ভবানীপুরে নিয়ে আসা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী।

Advertisement

বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে এদিন ফের অভিযোগ করেন তিনি। মঙ্গলবার বিজেপির বিরুদ্ধে সমস্ত দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাম-ডান ভুলে যান। যাঁরা এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে, তাঁরা সবাই এক জোট হোন। আমার পাশে থাকার দরকার নেই। মানুষের পাশে থাকুন।’

তাঁর দাবি, রাজ্যে এসআইআর ঘোষণার পর থেকেই এ নিয়ে তিনি সরব হয়েছেন এবং একাধিকবার নির্বাচন কমিশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এমনকি  তিনি দিল্লিতেও যান এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। মমতা এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্টে তাঁর সওয়ালের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘মনে রাখবেন, যেটুকু নাম উঠেছে, সেটাও আমার কোর্টে মামলা করার জন্য।’ সেই সঙ্গে কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করে মমতার হুঁশিয়ারি, ‘এই এসআইআর-ই ওদের শেষ করবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম বিবেচনাধীন অবস্থায় ছিল। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সোমবার গভীর রাতে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। যদিও সম্পূর্ণ তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়, তবে জানা যাচ্ছে যে প্রায় ২৮ লক্ষ ৬ হাজার নামের নিষ্পত্তি হয়েছে।

তালিকাটি বুথভিত্তিকভাবে দু’ভাগে প্রকাশ করা হয়েছে—একটিতে অন্তর্ভুক্ত ভোটারদের নাম এবং অন্যটিতে বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ভোটাররা তাঁদের এপিক নম্বর ব্যবহার করে অনলাইনে নাম যাচাই করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এই ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে এবং ধাপে ধাপে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। প্রায় ৭০৫ জন বিচারক এই তালিকা নিষ্পত্তির কাজ করছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরুর আগে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। সংশোধন প্রক্রিয়ার খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় দেখা যায়, সেখানে ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম বাদ পড়েছে। ফলে খসড়া তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০।

পরবর্তী পর্যায়ে, ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয় নির্বাচন কমিশনের তরফে। সেই তালিকায় আরও ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম বাদ যায়। সব মিলিয়ে ওই দিন পর্যন্ত মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২।

খসড়া তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫২ লক্ষ মানুষকে শুনানির জন্য চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৬ জন ‘নো-ম্যাপিং’ শ্রেণির ভোটার, যাঁরা ২০০২ সালের শেষ এসআইআরের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। বাকি প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারকে তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে (লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি) শুনানির জন্য ডাকা হয়।

সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারের শুনানি সম্পন্ন হয়। এই শুনানির ভিত্তিতে ৮২ লক্ষ ভোটারের নথি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে কমিশন, যা ইআরও এবং এইআরওদের মতামতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। তবে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৫ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়।

এই প্রক্রিয়ার শেষে প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪। এর মধ্যে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটার তখনও বিবেচনাধীন অবস্থায় ছিলেন, যাঁদের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া পরবর্তী ধাপে চালু রয়েছে।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, প্রায় ২৯ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, তবে চূড়ান্তভাবে কত নাম তালিকায় থাকবে তা বিচারকেরাই নির্ধারণ করবেন। পূর্ববর্তী শুনানিতে ইঙ্গিত মিলেছিল, নিষ্পত্তির পর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাম বাদ পড়তে পারে, কিন্তু এখনও সেই সংখ্যা স্পষ্ট করা হয়নি।  তালিকা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।

যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়বে, তাঁরা ট্রাইবুনালে আপিল করতে পারবেন। এই ট্রাইবুনাল গঠন করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়ে ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন—দু’ভাবেই আবেদন করা যাবে।

ইসিআইনেট মোবাইল অ্যাপ বা কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইন আবেদন করা যাবে। জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং মহকুমাশাসকের কাছে অফলাইনেও আবেদন করা যাবে। এই ট্রাইবুনাল এখন থেকেই কাজ শুরু করতে পারবে। সমস্ত আপিল নিষ্পত্তি হলে এই ট্রাইবুনালের কাজ শেষ হবে।

 

 

 

Advertisement