রাজ্যে আর এক বিএলও–র মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই নির্বাচন কমিশনকে দোষারোপ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পূর্ব বর্ধমানের পর এবার জলপাইগুড়িতে এক বিএলও–র মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন তথা এসআইআর–এর কাজের চাপে আত্মঘাতী হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায় এসআইআর আতঙ্কে এক প্রৌঢ়ের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে এসেছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, সরকারি নথিতে ভুল থাকায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন ওই প্রৌঢ়। সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক ছোটাছুটিও করেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এই আতঙ্কে ৫–৬ দিন ধরে খাওয়া–দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মঙ্গলবার তিনি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন বলে দাবি পরিবারের। রাজ্যে এই ধরনের মৃত্যুর জন্য কমিশনের ‘অপরিকল্পিত কাজ’কে দায়ী করেছেন মমতা। তাঁর আবেদন, অবিলম্বে এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করা হোক।
মৃত বিএলও–র নাম শান্তিমুনি এক্কা (৪৮)। তিনি ডুয়ার্সের মাল ব্লকের নিউ গ্লেনকো চা বাগান এলাকার বাসিন্দা। আদিবাসী ওই মহিলা পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছিলেন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় তিনি রাঙামাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২০/১০১ নম্বর বুথের বিএলও–র দায়িত্ব পান। মঙ্গলবার রাতে অন্যান্য দিনের মতো খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমোতে যান শান্তিমুনি। বুধবার ভোরে বাড়ি সংলগ্ন একটি গাছ থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। দেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। মৃতের পরিবারের অভিযোগ, এসআইআর–এর অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলাতে পারছিলেন না শান্তিমুনি। অঙ্গনওয়াড়ির কাজ করার পর বাড়ির কাজ সামলে রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশন ফর্ম দিয়ে ফর্ম পূরণ করার কাজ করছিলেন তিনি। এত কাজের চাপে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। শান্তিমুনির বুথের বেশিরভাগ মানুষ হিন্দিভাষী।
এদিকে এনুমারেশন ফর্ম সব বাংলায় এসেছে। সেজন্য ফর্ম পূরণ করার সময় ভুলভ্রান্তি হচ্ছিল। এজন্য প্রতিদিন বাড়িতে লোকজন আসছিলেন। এই কাজের চাপ নিতে না পেরে বিএলও–র দায়িত্ব ছেড়ে দিতে ব্লক অফিসে গিয়েছিলেন শান্তিমুনি। কিন্তু তাঁকে জানানো হয়, নাম যখন আছে তখন কাজ করতেই হবে। এরপর আরও ভেঙে পড়েন শান্তিমুনি। কয়েকদিন আগে পূর্ব বর্ধমান জেলায় ব্রেন স্ট্রোক হয়ে মৃত্যু হয় বিএলও নমিতা হাঁসদার। তিনি মেমারির চক বলরামপুরে ২৭৮ নম্বর বুথের বিএলও ছিলেন।
অন্যদিকে, বাদুড়িয়ার মৃত প্রৌঢ়ের নাম শফিকুল মণ্ডল (৫৭)। তাঁর বাড়ি বাদুড়িয়ার যদুরহাটি এলাকায়। পরিবারের দাবি, কয়েক পুরুষ ধরে তাঁরা বাদুড়িয়ায় বসবাস করছেন। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর শফিকুল দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর পরিচয়পত্রে যে বয়স লেখা আছে তার ব্যবধান প্রথম পক্ষের সন্তানদের থেকে কম। সরকারি নথিতে এই ভুল থাকায় আতঙ্কে ছিলেন শফিকুল। কীভাবে ভুল নথি ঠিক করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি। অনেকে তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে চলে যেতে হবে বলে ভয়ও দেখিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার পরিবারের সকলের নজর এড়িয়ে বাড়ির অদূরে একটি নির্জন জায়গায় গিয়ে বিষ খান শফিকুল। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে বাদুড়িয়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বুধবার তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বসিরহাট মর্গে নিয়ে যায় পুলিশ।
শফিকুলের ছেলে রুহুল আমিন মণ্ডল জানিয়েছেন, নথির ভুল সংশোধনের জন্য ১৫ দিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করছিলেন বাবা। গত কয়েক দিন ধরে খাবারও খাচ্ছিলেন না। অনেক বোঝানোর পরেও আতঙ্ক কাটছিল না তাঁর। এদিন খবর পেয়ে মৃতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যান বাদুড়িয়ার তৃণমূল বিধায়ক কাজি আবদুর রহিম দিলু।। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি এসআইআরের মাধ্যমে ভয় এবং আতঙ্কের আবহ তৈরি করেছে। এই মৃত্যুগুলির দায় তাদেরই। যদিও বিজেপির দাবি, এসআইআর নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বুধবার সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আজ ফের আমরা জলপাইগুড়ির মাল এলাকায় একজন বুথ লেভেল অফিসারকে হারিয়েছি। তিনি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছিলেন। এসআইআরের কাজের অসহনীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন তিনি। রাজ্যে এসআইআর ঘোষণার পরে আতঙ্কে ২৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেউ ভয়ে, কেউ অনিশ্চয়তায় আবার কেউ মানসিক চাপ তো কেউ আবার কাজের চাপে নিজেকে শেষ করে দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অপরিকল্পিত কাজের চাপে এতগুলো মূল্যবান জীবন হারিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, এসআইআরের জন্য আগে ৩ বছর সময় লাগত। এখন নির্বাচনের আগে ‘রাজনৈতিক প্রভুদের’ খুশি করার জন্য পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ২ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিএলওদের উপর অমানবিক চাপ তৈরি হচ্ছে। আমি নির্বাচন কমিশনকে বিবেক দিয়ে কাজ করার আবেদন জানাচ্ছি।” আরও প্রাণহানির ঘটনা আটকাতে অবিলম্বে এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করার আহ্বান জানান মমতা।
এদিন বিএলও-র মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তর এবং আদিবাসি উন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী বুলুচিক বরাইক। তিনি জানিয়েছেন, এসআইআর ফর্মের কাজ নিয়ে সব জায়গায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আদিবাসী অধ্যুষিত হিন্দিভাষী এলাকায় বাংলায় ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে ভুল হচ্ছিল। সেই আতঙ্ক ও মানসিক চাপে আত্মঘাতী হয়েছেন বিএলও।
Advertisement