শাস্ত্রমতে মকর সংক্রান্তির দিন সূর্য নিজের কক্ষপথ বদল করে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। সেই কারণে দিনটি মকর সংক্রান্তি হিসেবে পরিচিতি। হিন্দুদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অসীম। পুণ্যলাভের আশায় দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে মানুষ এই দিন সাগরে স্নান করতে ছুটে আসেন। মনোবাঞ্ছা পূরণের ইচ্ছে জানান সাগর পাড়ে দাঁড়িয়ে। ধনী-গরিবের আর্তি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জন্ম নেয় এক রূপকথার। গঙ্গাসাগর হয়ে ওঠে মানুষে মানুষে বন্ধনের স্থল। আনন্দ উদযাপনের স্থল। এবছর বুধবার ১টা ১৯ মিনিট থেকে শুরু হবে পু্ণ্যস্নান। চলবে পরদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ১৯ মিনিট পর্যন্ত। টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে চলবে পুণ্যস্নানের প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাগরপাড়ে ভিড় জমাবেন বিভিন্ন সাধকরা।
এ বছর কুম্ভমেলা নেই। তাই গঙ্গাসাগরে এসেছেন এক ‘মৌনীবাবা’। এই নামেই সবাই ডাকছেন তাঁকে। সাত বছর ধরে মৌনব্রত পালন করছেন এই সাধক। এক সময় খুবই কথা বলতেন মৌনীবাবা। আর বেশি কথা যে কোনও সাধকের আধ্যাত্মিক চেতনার উন্নতির পথে বাধা। গুরু অজয় ভারতী বারো বছর মৌন থাকার নির্দেশ দেন। গুরু আজ্ঞা পালন ব্রতী হন তিনি। তারপর থেকেই গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে বছরের পর বছর পালন করে চলেছেন মৌনীবাবা। প্রায় ৭ বছর হতে চলল তিনি কথা বলা বন্ধ করেছেন। অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন গুরুর আদেশ। আর গুরুর আদেশ পালন করেই তিনি হয়ে উঠেছেন সকলের কাছে মৌনীবাবা।
Advertisement
গুরু আজ্ঞা পূরণ হতে এখনও পাঁচ বছর দেরি। কিন্তু মৌনীবাবার নিষ্ঠার কোনও খামতি নেই। কারণ ‘গুরুই ব্রহ্মা গুরুই বিষ্ণু’। ‘গুরুর আদেশ বিনে জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়’। পাঁচবছর পর মৌনব্রত পূর্ণ হলে কী করবেন, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয় তাঁর কাছে। তিনি বলেন, ‘মুঝে মৌন আচ্ছা লগতা হ্যায়।‘ বাবুঘাট সংলগ্ন গঙ্গাসাগর ট্রানজিট ক্যাম্পে বসে জানালেন মৌনীবাবা। সামনে পবিত্র ধুনি। হালকা হালকা ধোঁয়া। আঁচ ঢিমে হলেই তাতে কাঠ জোগাচ্ছেন শিষ্য হনুমান গিরি। তুষার ঘেরা কেদারধাম থেকে যমুনা বিধৌত বৃন্দাবন ধাম সর্বত্রই বাবার ছায়াসঙ্গী হলেন হনুমান গিরি।
Advertisement
তবে মৌনীবাবা সাগরে যাবেন না। ট্রানজিট ক্যাম্পে থেকেই ফিরে যাবেন নিজভূমে। যাওয়ার আগে কলকাতাতেই সংক্রান্তিতে ডুবকি লাগাবেন। তারপর ডেরা ডান্ডা তুলে রাধাকৃষ্ণের লীলাভূমির দিকে রওনা দেবেন। কথা বলেন না ঠিকই। তবে কারোর প্রশ্নের উত্তর দিতে মৌনীবাবার কোনও সমস্যা হয় না। বাবা ডায়েরিতে লিখে উত্তর দেন। সোমবার ক্যাম্পে তিনি ময়ূরপালকের গোছা নিয়ে সবার মাথায় ছোঁয়াচ্ছিলেন। আর ভক্তরা হাত বাড়ালে দুটো করে বিভূতি মাখা রুদ্রাক্ষ দিচ্ছিলেন। অসুস্থতা হোক বা ব্যবসায় ক্ষতি, বাবার একটাই ওষুধ, ‘শুধু ঈশ্বরের নাম কর। নিজেকে সমর্পণ কর তাঁর চরণে। তবেই মিলবে সব সমস্যা থেকে মুক্তি।‘
গঙ্গাসাগরে ডুবকি দিতে ট্রানজিট ক্যাম্পে ডেরা বেঁধেছেন প্রায় সাড়ে পাঁচশো সাধু-সন্ত। তবে এসেছেন কয়েক হাজার। ‘গঙ্গাসাগর সাধু মহাসংঘ’-এর তরফে তারাপীঠের সমীরনাথ অঘোরী জানিয়েছেন, এবার সাধু সন্তের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অনেক উচ্চকোটির সাধু এসেছেন। কেদারের মৌনীবাবা, কামাখ্যার নিত্যানন্দ গিরি এসেছেন। কিন্নরী আখড়ার মহামণ্ডলেশ্বর গায়ত্রীনন্দ গিরি, জুনা আখড়ার জলেশ্বর গিরি, পুনম গিরি, মঙ্গল গিরি, ললিতানন্দ গিরি এসেছেন। আছেন বাংলার সাধকরাও।বনগাঁ থেকে পোষ্য হনুমান সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তপস্যা গিরি। দুর্গাপুর থেকে মলয়ানন্দ গিরি। গোপালকে কোলে নিয়ে দোলনায় দুলছেন তিনি। রয়েছেন ধর্ষকদের গুলি করে মারার ইচ্ছে নিয়ে সর্বত্যাগী এক নাগা সন্ন্যাসিনীও। এ যে সত্যিই মিনি ভারতবর্ষ।
গঙ্গাসাগর নিয়ে সতর্ক রাজ্য প্রশাসন। গঙ্গাসাগর মেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সড়কের উপরে হকার বসানো, পার্কিং কিংবা অটো স্ট্যান্ড রাখা উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। মকর সংক্রান্তির পুণ্যস্নানে যাতে তীর্থযাত্রীজেক কোনও রকম সমস্যা না হয় সে দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছে প্রশাসন। বুধবার মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে সাগরদ্বীপে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর সমাগম হবে। নবান্ন সূত্রে খবর, এই বিপুল সংখ্যক যাত্রীর বড় অংশই জাতীয় সড়ক ধরে সাগরদ্বীপে যাবে। ধর্মতলা থেকে বাসে প্রথমে কাকদ্বীপের লট নম্বর আটে নামতে হয়। সেখান থেকে ভেসেলে কচুবেড়িয়া এবং পরে আবার বাসে বা অটোতে মেলাপ্রাঙ্গণে পৌঁছোন পুণ্যার্থীরা। এই যাত্রাপথে যাতে কোনও ভাবেই যান চলাচলে অসুবিধা না হয়, সেই লক্ষ্যেই জাতীয় সড়ককে সম্পূর্ণ দখলমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন।
জাতীয় সড়কের যে সব অংশে স্থায়ী স্ট্রিট লাইট নেই, সেখানে অস্থায়ী ভাবে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উস্তি রোড, খড়িবেড়িয়া থেকে বিষ্ণুপুর থানা, শিরাকল থেকে কপাটহাট, ফলতার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বঙ্গনগর— এই সব জায়গায় অতিরিক্ত আলো বসানো হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলিতে ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করে দিনে-রাতে নজরদারি চালানো হচ্ছে। পৈলান থেকে হটুগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ২২টি অস্থায়ী পুলিশ বুথ বসানো হয়েছে। পুণ্যার্থীদের এখান থেকে সাহায্য করা হবে। সব মিলিয়ে মোতায়েন থাকবেন প্রায় ৬০০ প্রশিক্ষিত হোমগার্ড, সিভিক ভলান্টিয়ার ও ভিন জেলার পুলিশকর্মী। যানজটপ্রবণ আমতলা, খড়িবেড়িয়া ও নেতড়া মোড়ে বাড়তি নজরদারি থাকবে। এ ছাড়া গোটা রাস্তাজুড়ে রাখা হয়েছে সাতটি ব্রেকডাউন ভ্যান, যাতে কোনও যান খারাপ হলে দ্রুত সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায়।
কথায় আছে ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’ তা কিন্তু পুণ্যের নিরিখে নয়। এ প্রবচন জন্ম নিয়েছিল, দুর্বিষহ ও বিপদসঙ্কুল যাত্রাপথের কারণে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে গঙ্গাসাগর আসতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হতো, দ্বিতীয়বার আর তার মুখোমুখি হতে চাইতেন না কেউ। সেই জন্যই মাত্র ‘একবার’ এসে পূর্ণচ্ছেদ পড়ত পুণ্যলাভের আশায়। কপিলমুণির আশীর্বাদ মিলত জীবনে ওই একটিবারই। বর্তমানে অনেকেই মনে করেন, গঙ্গাসাগরের পুণ্য বুঝি একবার আহরণ করতে পারলেই যথেষ্ট, সেই কারণেই বুঝি এমন প্রবাদের সৃষ্টি। তা মোটেও সত্য নয়। সেযুগের যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ চেহারাই এই প্রবাদের জনক।
তবে এখনকার সবরকম ব্যবস্থাপনা দেখে মনে হয় গঙ্গাসাগরে বারবার আসাই যায়। তা আসছেনও অনেকে। শুধুই যে পুণ্যস্নানের টানে আসেন তা নয়, ব্যবসা করতেও আসছেন অনেকে। কেউ কেউ আসছেন শিল্পের টানে, কেউ আবার মিনি ভারতবর্ষ দর্শন করতে। ভিড়ের উন্মাদনায় নিজেকে ভাসিতে দিতে চাইছেন তাঁরা। থাকা, খাওয়া, পানীয় জল, শৌচব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, মেডিক্যাল পরিষেবা– সব মিলিয়ে চেষ্টার ত্রুটি নেই সরকারের।
Advertisement



