ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্যে ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে আতঙ্ক। উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ ও পশ্চিম বর্ধমানে পরপর মৃত্যু ও আত্মঘাতের ঘটনায় তীব্র প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও সচেতনতা। মৃতদের পরিবারগুলির একটাই অভিযোগ এসআইআর শুনানির নোটিস, বিভ্রান্তি ও ভয়ই তাঁদের প্রিয়জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস আগেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও কমিশনকে চিঠি দিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের মামুদপুর গ্রামের ঘটনা রাজ্যজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। ১০৩ নম্বর বুথের ভোটার, ৬২ বছরের ছোয়েদ শেখ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরিবারের দাবি, তাঁর পুত্র আবদুর রহমান ও কন্যা আনজুরা বিবিকে এসআইআর শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। পুত্র কর্মসূত্রে ভিন্রাজ্যে থাকায় হাজিরা দিতে পারবেন না, এই চিন্তাতেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন ছোয়েদ। হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও শেষরক্ষা হয়নি। ছোয়েদ কন্যার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘এসআইআর আতঙ্কই বাবার মৃত্যুর কারণ।’
Advertisement
মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরে আরও এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ৫৮ বছরের মোমিন আলি ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত নোটিস পেয়ে ভয়াবহ মানসিক চাপে পড়েন। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেই চিন্তা ছিল, ভিন্রাজ্যে থাকা ছেলেরা কীভাবে হঠাৎ হাজিরা দিতে আসবে। অভিযোগ, সেই আতঙ্ক থেকেই তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে সঙ্কটজনক প্রৌঢ়কে দেখতে হাসপাতালে যান তৃণমূলের মালদহ জেলা পরিষদের সদস্য বুলবুল খান। তাঁর বক্তব্য, ‘সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কত মানুষ আত্মহত্যা করছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে মারা যাচ্ছেন। তবু বিজেপি এবং কমিশনের হুঁশ ফিরছে না।’
Advertisement
শুনানির আতঙ্কে মুর্শিদাবাদে প্রাণ গেল ফিরোজ খানের (৫৪)। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ফিরোজের স্ত্রী পারভিনা বিবির নামে গত কয়েকদিন আগে এসআইআরের শুনানির নোটিস আসে। স্ত্রীর নামের গরমিল সংক্রান্ত কারণে এসআইআর নোটিস পাঠানো হয় বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, ফিরোজের আশঙ্কা ছিল, তাঁর স্ত্রীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। এরপর এই আতঙ্কে গভীর রাতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। আবার নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় পদবি-বিভ্রাটের কারণে শুনানির নোটিস পেয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ সামীর আলি দেওয়ানের। যদিও প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয়েছে, এটি শুধুই নথিগত অসঙ্গতি সংশোধনের প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে— এই প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে এত ভয়ের কেন?
বীরভূমের রামপুরহাট পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আত্মঘাতী জনি শেখ। স্থানীয়দের দাবি, ওই ওয়ার্ডে বহু মানুষকে এসআইআর শুনানির নোটিস দেওয়া হয়েছে। নোটিস পাওয়ার আশঙ্কাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন জনি। পরিবারের দাবি, ওই ওয়ার্ডে ১৭১ জনকে শুনানির নোটিস দিয়েছে কমিশন। তিনিও শুনানি নোটিস পেতে পারেন বলে আতঙ্কে ছিলেন। সেই কারণে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন। খবর পেয়ে রামপুরহাট থানার পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠিয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবি পশ্চিম বর্ধমানের সালানপুরে। প্রাক্তন রেলকর্মী, ৭০ বছরের নারায়ণচন্দ্র সেনগুপ্তের নাম খসড়া ভোটার তালিকায় না থাকায় তাঁকে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়। পরিবারের দাবি, আধার, পিএফ পেনশন বুকের মতো নথি নিয়েও বারবার প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। কয়েকদিন ধরেই চরম মানসিক চাপে ছিলেন বৃদ্ধ। সেই চাপই শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নেয়।
পরপর এই মৃত্যুর ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন— ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে না তো? সচেতনতা ছাড়া, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া চালানো এমন প্রক্রিয়া কি গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক নয়? এসআইআর নিয়ে ছড়িয়ে থাকা ভয়, বিভ্রান্তি ও গুজব দূর করতে অবিলম্বে প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা ও মানবিক উদ্যোগ প্রয়োজন— এটাই এখন রাজ্যবাসীর দাবি।
Advertisement



