• facebook
  • twitter
Thursday, 29 January, 2026

সাংবিধানিক পদাধিকারীদের বিশ্বভারতীর ‘বিশেষ তালিকা’ নিয়ে বিতর্ক

আগেও এই ধরনের পদমর্যাদার ব্যক্তিদের প্রবেশে কোনও বাধা ছিল না। নতুন করে তা আলাদা করে ঘোষণা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন ও আশ্রম চত্বরে প্রবেশ সংক্রান্ত নতুন বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে ফের তীব্র বিতর্কে জড়াল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনুমতি ও প্রবেশমূল্য ছাড় সংক্রান্ত নির্দেশিকায় দেশের ১০৬টি উচ্চপদস্থ সাংবিধানিক পদাধিকারীর নাম ও পদমর্যাদার তালিকা প্রকাশ করাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন আশ্রমিক, প্রাক্তনী এবং ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্বভারতীর ইতিহাসে এই প্রথম প্রকাশ্যভাবে নির্দিষ্ট পদাধিকারীদের নাম উল্লেখ করে এমন বিজ্ঞপ্তি জারি করা হল, যা শান্তিনিকেতনের ভাবধারা, শালীনতা ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

বিশ্বভারতীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি, সামরিক প্রধান, রাষ্ট্রদূত-সহ মোট ১০৬টি উচ্চ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পদমর্যাদার ব্যক্তিরা কোনও প্রবেশমূল্য ছাড়াই রবীন্দ্রভবন মিউজিয়াম ও আশ্রম এলাকার হেরিটেজ ওয়াক পরিদর্শন করতে পারবেন। এই নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উপাচার্য প্রবীর কুমার ঘোষের অনুমোদনক্রমে পূর্ববর্তী সমস্ত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে নতুন নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে।

Advertisement

আর এই তালিকাভুক্ত বিজ্ঞপ্তিকেই ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। প্রাক্তনী ও প্রবীণ আশ্রমিকদের বক্তব্য, অতীতেও দেশের ও বিদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি শান্তিনিকেতন পরিদর্শনে এসেছেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে ও স্বাভাবিক নিয়মেই সেই পরিদর্শন হয়েছে। কখনও আলাদা করে এমন প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ‘বিশেষ শ্রেণি’র তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

Advertisement

প্রবীণ আশ্রমিক ও ঠাকুর পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় ঠাকুর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘দেশের সাংবিধানিক প্রধান পদাধিকারীদের সর্বত্রই প্রবেশে কোনও বাধা থাকে না। বিশ্বভারতীতেও এতদিন কখনও এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি। নতুন করে তালিকা প্রকাশ করা শোভনীয় নয় এবং এতে বিভ্রান্তি ছড়ায়।’

একই সুরে প্রবীণ আশ্রমিক সুব্রত সেন মজুমদার বলেন, ‘উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা স্বাভাবিক নিয়মেই শান্তিনিকেতনে আসেন ও পরিদর্শন করেন। আলাদা করে তাঁদের নাম উল্লেখ করে প্রবেশমূল্য ছাড়ের তালিকা প্রকাশ করা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর।’

বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য সবুজকলি সেনের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তিটি এখনও বিস্তারিতভাবে দেখিনি। তবে আগেও এই ধরনের পদমর্যাদার ব্যক্তিদের প্রবেশে কোনও বাধা ছিল না। তাঁদের সাংবিধানিক মর্যাদার কারণেই সর্বত্র এই সুবিধা দেওয়া হয়। নতুন করে তা আলাদা করে ঘোষণা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’

শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের সম্পাদক অনিল কোনার আরও কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্বভারতী একটি বিশেষ হেরিটেজ এলাকা হলেও নির্দিষ্ট পদমর্যাদার মানুষের জন্য আলাদা করে নিয়ম দেখানো যুক্তিযুক্ত নয়। এতে শান্তিনিকেতনের সার্বজনীনতা ও মানবিক দর্শনের বিরোধিতা করা হয়।’

আশ্রমিক মহলের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় গড়ে ওঠা শান্তিনিকেতন ছিল সমতা, মানবিকতা ও সর্বজনীনতার প্রতীক। সেখানে এমন ‘বিশেষ সুবিধাভোগী তালিকা’ প্রকাশ শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আদর্শগতভাবেও প্রশ্ন তুলছে বিশ্বভারতীর বর্তমান পরিচালন ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

এই বিতর্ক ক্রমশ বড় আকার নিচ্ছে। আশ্রমিক, প্রাক্তনী ও সংস্কৃতি-অনুরাগী মহলে দাবি উঠছে, অবিলম্বে এই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার করে শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য ও ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নীতিতে ফিরে যাওয়া হোক। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের তরফে যদিও এখনও পর্যন্ত এই বিতর্ক নিয়ে কোনও স্পষ্ট অবস্থান বা ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

Advertisement