এসআইআর-এর ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনকে একাধিকবার চিঠিও দিয়েছেন মমতা। রবিবার তিন নম্বর চিঠিটি লেখেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর সোমবার গঙ্গাসাগরে থেকে এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের হয়ে সওয়ালও করবেন বলে জানিয়েছেন মমতা।
প্রস্তুতি না নিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়া হওয়ায় বিস্তর সমস্যা হচ্ছে। অযথা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই অভিযোগ তুলে রবিবারই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, কমিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
Advertisement
সাড়ে তিন পাতার চিঠিতে তিনি এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জানান, এগুলির সমাধান না-হলে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়ে যাবে। বহু বৈধ ভোটার ভোটাধিকার হারাবেন বলেও আশঙ্কাপ্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলের একটি সূত্র বলছে, এই বিষয়গুলিকে মামলায় নথি হিসাবে দেখাতে চাইছেন নেতৃত্ব। তার আগে সোমবার মমতা জানিয়ে দিলেন, মঙ্গলবার আদালত খুলবে। তার পরে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে চলেছেন।
Advertisement
তিনি বলেন, ‘আমরা আইনের সাহায্য নিচ্ছি। আগামীকাল কোর্ট খুলবে। আইনের পথে যাব। প্রয়োজন পড়লে আমিও সুপ্রিম কোর্টে মানুষের হয়ে প্লিড করব।‘ তিনি যে একজন আইনজীবী তাও এদিন মনে করিয়ে দেন। এসআইআর আতঙ্কে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ শাসকদলের। এমনকী এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির লাইনে দাঁড়িয়েও মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ। ‘হোয়াটস অ্যাপে’র মাধ্যমেই কমিশন চলছে বলেও কটাক্ষ করেছেন মমতা।
সোমবার গঙ্গাসাগরে দাঁড়িয়ে একযোগে কমিশন এবং বিজেপিকে নিশানা করেন। জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিস কুমার’ বলেও কটাক্ষ ছুঁড়ে দেন তিনি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘মিস্টার ভ্যানিশ কুমার, নো ডিটেনশন ক্যাম্প ইন বেঙ্গল।’ মমতা এ দিনও জানান, এসআইআর নাম তুলতে সকলেই চান। তবে বছর দু’য়েক সময় নিয়ে এসআইআর হওয়া দরকার ছিল। এসআইআর-এ শুনানির নামে বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বাদের যে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা নিয়েও এ দিন সরব হন তিনি।
সোমবার গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরেই তিনি এসআইআরের শুনানির সময়ে সাধারণ মানুষের হেনস্থা নিয়ে সরব হন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে খসড়া তালিকায় ৫৪ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। ‘খুনিদেরও’ নিজেদের হয়ে সওয়াল করার অধিকার রয়েছে। এখন এআই-এর মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে কার নাম বাদ যাবে, কার থাকবে। তার পরেই মমতা জানান, তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন। তাঁর কথায়, ‘আমরাও আইনের সাহায্য নিচ্ছি। মঙ্গলবার কোর্ট খুলবে। আমরাও আদালতে যাব। এত মানুষের মৃত্যু, এত মানুষকে যে ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আদালতে যাব।’
এর পরেই মমতা জানান, প্রয়োজনে তিনি নিজেও সওয়াল করবেন। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন পড়লে নিজেও অনুমতি চাইব। দরকার হলে আমিও সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মানুষের হয়ে প্লিড করব। মানুষের হয়ে কথা বলব। আমি আইনজীবী। তবে আইনজীবী হয়ে যাব না। সাধারণ নাগরিক হিসাবে যাব। আমি আমার কথা বলতেই পারি। কথা বলার অনুমতি নেব। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাব, তৃণমূল স্তরে কী চলছে, কী ভাবে মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বয়স্ক লোকেরা নাকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে যাচ্ছেন শুনানিতে। কারও ৮৫ বছর বয়স। অন্তঃসত্ত্বাকেও ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। এত দিন পরে প্রমাণ করতে হবে, এ দেশের নাগরিক কি না।’ মমতার প্রশ্ন, ওবিসি, এসসি, এসটি শংসাপত্র নথি হিসাবে কেন গৃহীত হবে না। আধার কার্ড কেন নথি হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়, সেই প্রশ্নও তিনি করেছেন।
মমতার মতে, এসআইআর হোক দু’বছর সময় নিয়ে। ‘গায়ের জোরে’ কেন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যে ৭০ জন মারা গিয়েছেন। অনেকে সুইসাইড করতে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি।‘ এর পরে বিজেপির বিরুদ্ধে আরও সুর চড়িয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘দিল্লির নেতাদের নেতা বলেছেন, লক্ষ্মীদের বাড়ি থেকে বার হতে দেবেন না ভোটের দিন। বন্দি করবে রাখবেন। আমি বলি, লক্ষ্মীদের তো চেনো না। এরা পাঁচালি যেমন পড়ে, রান্না করে, শিল্প করে, ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সৃষ্টি করে। মহিলারা কারও মা, কারও বোন, কারও মাসি। ওরা শাসানি দিচ্ছে। এত বড় ক্রিমিনাল অফেন্স!’
গঙ্গাসাগর যাওয়ার জন্য নতুন সেতুর শিল্যান্যাস করে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁর সরকার শুধু মুখে বলে না, কাজেও করে দেখায়। ১৭০০ কোটি টাকা খরচ করে চার লেনের সেতু তৈরির পর গঙ্গাসাগরে যাওয়ার সমস্যা মিটবে। সে কথা জানিয়ে মমতা বলেন, ‘সব সাগর এক বার, গঙ্গাসাগর বার বার।’ ২০১১ সালের পর থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য কী কী কাজ করেছে তাঁর সরকার, তা জানান।
কত কোটি টাকার প্রকল্প হয়েছে, আরও কী কী প্রকল্পের কাজ শুরু হবে, তা-ও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গঙ্গাসাগরে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি, মেলাপর্বে কোনও পুলিশ বা প্রশাসনের আধিকারিক, কর্মী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাসের পরে মমতা জানান, এটি তৈরি হলে কাকদ্বীপের লট-৮ থেকে কচুবেড়িয়া পৌঁছোতে আর ভেসেল বা ফেরির উপর নির্ভর করতে হবে না।
আগামী দু’ থেকে তিন বছরের মধ্যে এই সেতু তৈরি হয়ে যাবে। চার লেনের অত্যাধুনিক সেতু তৈরিতে খরচ পড়বে ১,৭০০ কোটি টাকা। নির্মাণের বরাত দেওয়া হয়েছে এলএনটি (লারসন অ্যান্ড টুব্রো) সংস্থাকে। তাঁর কথায়, ‘একটু হলেও বাংলার মানুষের জন্য, সারা বিশ্বের পর্যটকের জন্য, পুণ্যার্থীদের জন্য, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল-সহ সকলের জন্য গর্ববোধ করছি। আমরা মুখে বলি না। কাজে করি।’ তিনি জানিয়েছেন, এই সেতু তৈরি হলে গঙ্গাসাগরের মানুষের ‘যন্ত্রণা’ কমবে। সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’কে বিজেপি ‘ব্যঙ্গ’ করছে বলেও এদিন জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
Advertisement



