• facebook
  • twitter
Saturday, 17 January, 2026

বিজেপির লিড মানেই সিপিএমের হার্মাদদের অক্সিজেন: অভিষেক

গড়বেতার জনসভা থেকে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন—গতবারের মতো আর ১৩-২ নয়, এবার পশ্চিম মেদিনীপুরে লক্ষ্য ১৫-০

ভোটের মুখে পশ্চিম মেদিনীপুরে কার্যত নির্বাচনী রণঘোষণা করলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার গড়বেতার জনসভা থেকে তিনি স্পষ্ট করে দিলেন—গতবারের মতো আর ১৩-২ নয়, এবার পশ্চিম মেদিনীপুরে লক্ষ্য ১৫-০। সভামঞ্চ থেকেই দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে অভিষেকের কড়া বার্তা, “মেদিনীপুরে বিজেপি লিড পাওয়া মানেই সিপিএমের হার্মাদদের অক্সিজেন দেওয়া। এই মাটি থেকে বিজেপি-সিপিএম—দু’জনকেই ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে।”
গড়বেতার এই জনসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব। সভায় যোগ দেন মন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা,মানস রঞ্জন ভুইয়া, সাংসদ জুন মালিয়া, মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অজিত মাইতি সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ।
একসময় বামেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মেদিনীপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস টেনে অভিষেক বলেন, এই জেলায় একসময় সিপিএমের হার্মাদরা কীভাবে মানুষের উপর সন্ত্রাস চালিয়েছে, তা মেদিনীপুরবাসী নিজের চোখে দেখেছে। ঘরে আগুন লাগানো, পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়া, জল বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আজ সেই হার্মাদরাই বিজেপির জার্সি পরে নতুন রূপে হাজির হয়েছে। তাঁর কটাক্ষ, “বোতল নতুন, মদ পুরনো। জার্সি বদলেছে, চরিত্র বদলায়নি।”
সভায় একে একে নাম করে অভিষেক অভিযোগ করেন, সিপিএমের সন্ত্রাসখ্যাত বহু নেতা—যাঁদের বিরুদ্ধে ছোট আঙারিয়া গণহত্যা-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে—আজ বিজেপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। শালবনি, কেশপুর, চন্দ্রকোনা, দাসপুর, ঘাটাল—প্রতিটি এলাকার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির আসল চেহারা এটাই। তাই কোনও বুথে বিজেপিকে লিড দেওয়া মানে সিপিএমের সন্ত্রাসীদের ফের অক্সিজেন দেওয়া।
এসআইআর  ইস্যুকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ জানান  অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বাংলার যোগ্য ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপরিকল্পিত চক্রান্ত চলছে। খসড়া তালিকায় একের পর এক জীবিত মানুষকে মৃত দেখানো হচ্ছে। এমনকী ২০০২ সাল থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকা নাগরিকদেরও শুনানিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ ভয় ও আতঙ্কে ভুগছেন। অভিষেকের দাবি, “এসআইআর আতঙ্কে এখনও পর্যন্ত ৮৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেউ অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন, কেউ আত্মহত্যা পর্যন্ত করছেন। এটা সরাসরি গণতন্ত্রের উপর আঘাত।”
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এসআইআর-এর সময়সীমা প্রথমে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল। বিজেপি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফর্ম জমা দিতে না পারায় সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ১৯ জানুয়ারি করা হয়েছে। অভিষেকের অভিযোগ, “বাংলার জন্য এক নিয়ম, গুজরাটের জন্য আর এক নিয়ম—এটা চলতে পারে না।” মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “উনি এত জীবিত মানুষকে মৃত দেখছেন, নিশ্চয়ই চোখে সমস্যা আছে। বাংলায় নতুন প্রকল্প চালু করতে হবে—‘ছানিশ্রী’। বিজেপি নেতাদের আর কমিশনের ছানি অপারেশন করাতে হবে।”
প্রতিটি সভার মতো গড়বেতাতেও নির্বাচন কমিশনের মৃত বলে চিহ্নিত কয়েকজন জীবিত ভোটারকে মঞ্চে তুলে ধরেন অভিষেক। এই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, কীভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নামে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাঁকুড়ায় ফর্ম-৭ ভর্তি গাড়ি আটকানোর প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক অভিযোগ করেন, বিজেপি শেষ মুহূর্তে অবৈধভাবে হাজার হাজার ফর্ম জমা দিয়ে তৃণমূল সমর্থক ভোটারদের নাম বাদ দিতে চাইছে। দলের কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর নির্দেশ, ১৬ থেকে ১৯ জানুয়ারির মধ্যে যদি কোনও বিজেপি নেতা ইআরও অফিসে ১০টির বেশি ফর্ম জমা দিতে আসে, তাহলে ভদ্রভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে বাজিয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে। প্রয়োজনে বিজেপির ছোট-বড় নেতাদের বাড়ি ঘেরাও করার কথাও বলেন তিনি।
কেন্দ্রীয় বঞ্চনার প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, বাংলার প্রাপ্য বাড়ির টাকা, জলের টাকা, রাস্তার টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। তৃণমূল সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, আবাস, স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, ততদিন বাংলার মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না কেউ—এই আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকার আরও ২০ লক্ষ মানুষকে বাড়ি দেবে।
খড়গপুরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করে গড়বেতার সভা থেকে  সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, জেলা তৃণমূল সভাপতি অজিত মাইতির সঙ্গে হিরণ একসময় তাঁর অফিসে এসে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে স্থানীয় মানুষের অনুভূতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখেই সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্পষ্ট করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, শুধু হিরণ নন, মেদিনীপুরের আরও দু’জন বিজেপি বিধায়ক এখনও দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কিন্তু জনতার দাবি ও দলের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে তাঁদের জন্য তৃণমূলের দরজা আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়েও বিজেপিকে আক্রমণ করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, বিজেপি বা সিপিএম কেউই এই প্রকল্প করেনি। উল্টে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। সংসদে দেব বারবার ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের দাবি তুলেছেন, শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারই এই প্রকল্পে অর্থ দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, এই মাটি বিপ্লবীদের মাটি। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলায় দাঁড়িয়ে মোদি-শাহকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রসঙ্গ তুলে বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “বিদ্যাসাগর না থাকলে মোদি-শাহ নিজের নাম লিখতে পারতেন না।”
সভা থেকে শুভেন্দু অধিকারীকেও নাম না করে কড়া আক্রমণ করেন অভিষেক। স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২০ সালে এই মেদিনীপুরের মাটিতেই একজন নেতা নিজের জেলযাত্রা বাঁচাতে অমিত শাহের পদলেহন করে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “এই মেদিনীপুরে বিজেপির কোনও লিড মানে সিপিএমের হার্মাদদের শক্তিশালী করা। এটা কখনও হতে দেওয়া যাবে না।”
বক্তৃতার শেষ দিকে বুথস্তরের কর্মীদের উদ্দেশে অভিষেক বলেন, মানুষের ভয় কাটানোই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। “একদিকে ইডি, একদিকে নির্বাচন কমিশন —ভয় দেখিয়ে আমাদের দমাতে চাইছে। কিন্তু ভোটাধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এই লড়াই ভোটের মাধ্যমেই জবাব দিতে হবে।”গড়বেতার সভা থেকে দেওয়া এই ঝাঁঝালো বার্তায় স্পষ্ট—ভোটের আগে পশ্চিম মেদিনীপুরে তৃণমূলের রাজনৈতিক সুর চরমে। ‘১৫-০’-র লক্ষ্য সামনে রেখে বিজেপি ও সিপিএম—দু’দলকেই একযোগে চাপে রাখতে চান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement

Advertisement