• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 5 July, 2026

জনবিজ্ঞান আন্দোলনের এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ মজুমদার

নিত্যানন্দ ঘোষ পশ্চিমবঙ্গে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের ধারা তৈরি হয়ে যায় নকশাল আন্দোলনের ভাটার পর্বে জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর৷ এই পর্বেই নকশাল আন্দোলনে যুক্ত থাকা বা না থাকা বেশ কয়েকজন কৃতী ব্যক্তি বা বামপন্থী দলে যুক্ত থাকা গোষ্ঠী গণবিজ্ঞান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন৷ তাঁদের বেশ কয়েকজন যুক্তিবাদী, কুসংস্কার-বিরোধী অবস্থান বজায় রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা

জনবিজ্ঞান আন্দোলনের এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ মজুমদার

নিত্যানন্দ ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের ধারা তৈরি হয়ে যায় নকশাল আন্দোলনের ভাটার পর্বে জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর৷ এই পর্বেই নকশাল আন্দোলনে যুক্ত থাকা বা না থাকা বেশ কয়েকজন কৃতী ব্যক্তি বা বামপন্থী দলে যুক্ত থাকা গোষ্ঠী গণবিজ্ঞান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন৷ তাঁদের বেশ কয়েকজন যুক্তিবাদী, কুসংস্কার-বিরোধী অবস্থান বজায় রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনা ও বিজ্ঞান মানসিকতা গড়ে তুলতে বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন মাতৃভাষায় (এক্ষেত্রে বাংলা ভাষায়)৷ মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি ছিলেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু৷ তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান পরিষদও গড়ে ওঠে৷ যে প্রতিষ্ঠান তাঁরই ভাবধারায় আজও গণবিজ্ঞান প্রচার ও প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছে৷ ১৯৭৭ পরবর্তী পর্যায়ে বা ওই সময় যাঁরা হাতেকলমে বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ কিংবা কুসংস্কারবিরোধী ও যুক্তিবাদী মননে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের প্রসার ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন সমর বাগচি, অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ মজুমদার, মনীন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, সুজয় বসু, সিদ্ধার্থ ঘোষ, ভবানীপ্রসাদ সাহু, প্রবীর ঘোষ, অমলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ৷ এঁদের অনেকেই আজ প্রয়াত৷ সমরদা ২০২৩-এ, অশোকদা ২০০৮-এ এবং রবীনদা এই বছর মাসখানেক আগে প্রয়াত৷

এই আলোচনা সদ্যপ্রয়াত রবীন্দ্রনাথ মজুমদারকে নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে৷ অশোকদার আগে রবীনদা বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৯৭৭-র জুলাই মাসে৷ অশোকদা শুরু করেন ১৯৮০ সালে৷ প্রথমজন ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ ও অশোকদা ‘মানুষ’ (১৯৮১ ‘উৎস মানুষ’ নামে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পরে)৷ বলতে দ্বিধা নেই ‘উৎস মানুষ’ প্রচার ও প্রসারে অনেকটাই এগিয়ে ছিল ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’র থেকে৷ অশোকদা ‘উৎস মানুষ’-এর একটা গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন যাঁরা প্রত্যেকে দ্বিগুণ উৎসাহে পত্রিকার প্রকাশ ও প্রচার প্রসারে উদ্যোগী ছিলেন৷ এমনকী গোষ্ঠীর মধ্যে না থেকেও ১৯৮০-র শুরুর দিকে লিটল ম্যাগাজিন অন্তপ্রাণ বন্ধু চন্দন ঘোষ (প্রয়াত) ও এই প্রতিবেদক ময়দানের বইমেলাতেও ‘উৎস মানুষ’ ভালোবেসে বিক্রি করেছে৷ রবীনদাকে সেভাবে সাহায্য করার কেউ ছিলেন না৷ একমাত্র সত্য (পদবি মনে নেই) ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’র অন্যতম রবীনদার সহযোগী ছিল৷ বন্ধু সত্যের ১৯৯০-র দশকেই অকালপ্রয়াণও হয়৷ সে কাজ করত পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফে, ডালহৌসিতে৷ একই সঙ্গে রবীনদার সঙ্গে ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ পত্রিকাও করত৷

দ্বিমাসিক পত্রিকাটি রবীনদা প্রথম পর্বে ১৯৭৭-র জুলাই থেকে জুন ১৯৮৩ পর্যন্ত প্রতি বছর ছয়টি করে সংখ্যা নিয়মিত বের করেছেন৷ কিন্ত্ত ১৯৮৩-তে বের করেছেন মোট ৫টি সংখ্যা— সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর একটি যুগ্ম সংখ্যা ধরে৷ এরপর থেকেই কখনও একক এবং বেশিরভাগ সময় যুগ্ম সংখ্যা হিসাবে ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ বেরিয়েছে৷ এরপর ১৯৯৩ সালে পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায় এবং পুনরায় ১৯৯৪ থেকে নতুন ফরম্যাটে পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে৷ তা দ্বিমাসিক থেকে ত্রৈমাসিকে পরিণত হয়৷ ত্রৈমাসিক ও যুগ্ম সংখ্যা হয়ে বেরিয়েছে ডিসেম্বর ১৯৯৭ পর্যন্ত৷ তারপর পত্রিকাটি বছরে একটি সংখ্যা হয়ে বেরিয়েছে ২০২২ সাল পর্যন্ত কিন্ত্ত তারপরে আর কোনও সংখ্যা বেরোয়নি৷ বিষয়বস্ত্ততে দেশ দুনিয়ার খবর থাকলেও তা প্রকৃত অর্থে স্থানীয়দের যা কাজে লাগে সেই উদ্দেশ্য নিয়েই বের করতেন৷ সুন্দরবনে রাসায়নিক সার কারখানা গড়ে ওঠার বিরুদ্ধে বা পরমাণু বিদু্যৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধেই হোক রবীনদা পত্রিকাতে বিষয়বস্ত্ত হিসাবে জনমত যেমন গড়ে তুলেছেন, নিজেও গণবিজ্ঞান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে থেকেছেন৷ এমনও দেখা গিয়েছে পোখরান বিস্ফোরণের (১৯৯৮) পর ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ পত্রিকায় রবীনদা ৪১টি নিবন্ধ ও রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন৷ আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ১৯৯৮ এর ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবসে কলকাতায় গণবিজ্ঞান আন্দোলনের তরফে শিয়ালদহ থেকে বিড়লা

প্ল্যানেটোরিয়াম পর্যন্ত যে বিশাল মিছিল সংগঠিত হয়েছিল রবীনদা তাতেও সামিল হয়েছিলেন৷ সাধারণ মানুষের স্বার্থে ভোপাল মিক (মিথাইল আইসোসায়ানাইড) গ্যাস দুর্ঘটনা সহ বহু গণবিজ্ঞানের আন্দোলনে ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’কে যেমন সামিল করিয়েছেন, নিজেও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন৷
‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ হোমিওপ্যাথি এবং আকুপাংচার চিকিৎসার পদ্ধতি হিসাবে কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখে সেই বিষয়ে মূল্যায়ন করেছে৷ একইসঙ্গে প্রথম বিশ্বের দেশ ড্রাগ ট্রায়ালে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের যেভাবে গিনিপিগ করে তারও সমালোচনা করেছে৷ এই দেশেও যাঁরা সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত তাদের অভাব অভিযোগ পত্রিকার পাতায় তুলে ধরেছেন রবীনদা৷ পশ্চিমবাংলায় বিজ্ঞানের পাঠ্যসূচি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অবৈজ্ঞানিক বিষয়বস্ত্ত পাঠ্য পুস্তকগুলিতে যেভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছিল ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ সেগুলিও মূল্যায়ন করেছে৷ একইসঙ্গে অচিরাচরিত বিজ্ঞান শিক্ষা, বিশেষ করে পরীক্ষামূলক যাকে বলা হয় হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষা— মধ্যপ্রদেশের বিজ্ঞান সংগঠন ‘একলব্য’ যা করে থাকে, রবীনদাও তাঁর পত্রিকার মধ্য দিয়ে এ রাজ্যে করার চেষ্টা করেছেন৷ ‘একলব্য’-এর মতো অন্যান্য জনআন্দোলন যেমন ছত্তিশগড়ের শহিদ হাসপাতাল কিংবা লাতিন আমেরিকার জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের মতো আন্দোলনগুলিতে ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ যুক্ত থেকেছে৷ এসবের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবাংলায় গণবিজ্ঞান আন্দোলনের ধারাকে পোক্ত ও পুষ্ট করার কাজ করেছেন রবীনদা৷

বর্ধমান জেলার মেমারি অঞ্চলের এক গ্রামে ১৯৪৬ সালের ২৪ নভেম্বর রবীনদার জন্ম৷ নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন থেকে রসায়ন শাস্ত্রে সাম্মানিক স্নাতকে ভর্তি হন এবং প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন৷ এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.টেক ও এম.টেক ডিগ্রিলাভ এবং উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে৷ একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে পিএইচডি এবং ১৯৭৪ সালে কেমিক্যাল টেকনোলজি বিভাগে শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ ইংলন্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৪-৮৫ সালে পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপে যোগ দেন৷ ফিরে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন একই বিভাগে এবং ১৯৯৩-৯৫ পর্যন্ত কেমিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন৷ তাঁর পড়াশোনা ক্লাসরুমের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ যেমন ছিল না, গবেষণাও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে নিবদ্ধ ছিল না৷

‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ এবং রবীনদাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না— যেতও না৷ ওইরকম একজন কৃতী মানুষকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি একজন অসাধারণ মানুষ৷ যেকোনও বিজ্ঞান আন্দোলনে কিংবা গণআন্দোলনের কর্মসূচিতে দেখা হলে সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন এবং পত্রিকা যাঁরা পাননি তাঁদের দিতেন ঝুলি থেকে বের করে৷ শেষের দিকে পত্রিকা প্রকাশ যখন বন্ধ করে দিয়েছেন দেখা হলে বিনা পয়সাতেই শেষ সংখ্যাটি বিতরণ করতেন৷ ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’র বহু সংখ্যার বিষয়বস্ত্ত ছোট পুস্তিকাকারেও বের করে বিলি করেছেন৷ সেরকমই একটি পুস্তিকা ছিল ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রাথমিক হালচাল’, ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান শিক্ষা ও মাধ্যমিক হালচাল’৷ পরিবেশ দূষণের উপর ১৯৯৮ সালে বই লিখেছিলেন ‘পরিবেশ দূষণ পরিচিতি ও পরিমাপ’৷ মণিদার (মণীন্দ্র মজুমদার) সঙ্গে পরিবেশের উপর পরিবেশবিদ্যা সংক্রান্ত বই ‘পরিবেশবিদ্যা পরিচয়’ লিখেছেন ২০০২ সালে৷ এই বই পশ্চিমবাংলার স্নাতক স্তরে পরিবেশবিদ্যা হিসাবে অবশ্য-পাঠ্য ছিল৷ অন্যান্য পুস্তিকাগুলির মধ্যে ‘বিজ্ঞান আন্দোলনের সন্ধানে’ (১৯৭৯) এবং ২০১৬ সালে লেখা ‘ভারতের আমআদমির জনবিজ্ঞান ও প্র.যুক্তি’ এবং ‘বিজ্ঞান আন্দোলন অথবা কূপমণ্ডুকতার চর্চা’ উল্লেখযোগ্য৷ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অবদান ও স্বপ্ন নিয়ে একটি দৈনিকে বেশ কয়েকটি উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছিলেন৷ আচার্য যেমন বিজ্ঞান, সমাজ ও মানব এই ত্রিফলার উপর জোর দিতেন তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে রবীনদা ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’তে ‘বিজ্ঞান সমাজ ও মানুষ’ শিরোনামে ২০০৬ সালে বেশ কিছু লেখা ছেপেছিলেন৷

রবীনদার মৃতু্যর পর খুব বেশি চর্চা হয়নি৷ ‘ফ্রন্টিয়ার’ (সমর সেন প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত ইংরেজি সাপ্তাহিক, বর্তমানে তিমির বসু সম্পাদক) পত্রিকায় সব্যসাচী চ্যাটার্জি একটি প্রতিবেদন লিখেছেন৷ মানুষের জন্য যাঁরা নীরবে নিঃশব্দে কাজ করে যান তাঁদের কথা কেই-বা ভাবে? শুধু ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানকর্মী’ পরিবারেই নয়, রবীনদার স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে জনবিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মীসমর্থকদের মধ্যেও৷