গতকালই জাপানকে হারিয়ে এশিয়ার সেরা হকি খেলিয়ে দেশের শিরোপা অর্জন করেছে ভারত। এশিয়ান গেমস হকিতে পুরুষ ও মহিলা, দুই বিভাগেই সোনা জিতেছে ভারত। হকিতে এই মহাদেশে ভারতের দাপট বরাবরের।
কিন্তু হকির আর এক ফরম্যাটে ভারতের অবদান শূন্যই বলা যায়। আইস হকি, যা ইউরোপ, আমেরিকায় বেশ জনপ্রিয়, তা ভারতেও জনপ্রিয় নয় কেন? পরিকাঠামো ও সে রকম আবহাওয়ার অভাবে? কিন্ত এ দেশে তো বরফে ঢাকা অঞ্চলের অভাব নেই। বিশেষ করে শীতের দিনগুলোতে।
হিমালয়ের সেরকমই কিছু অঞ্চলে আইস হকির প্রসারে সচেষ্ট হয়েছে রয়্যাল এনফিল্ড, যে নামের সঙ্গে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু আছে বলে মনে হয় না। এই শীতের মরসুমে তাদের উন্নয়নমূলক আইস হকি কর্মসূচির চতুর্থ সংস্করণ আয়োজন করতে চলেছে এই বিখ্যাত মোটরবাইক সংস্থা। এ দেশে আইস হকির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এখন তারাই।
শুধু আইস হকির খেলোয়াড় তৈরি নয়, স্থানীয় কোচ, গোলরক্ষক এবং ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে হিমালয় অঞ্চলে আইস হকির দীর্ঘমেয়াদি পরিকাঠামো গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
আগামী ৯ থেকে ১৩ নভেম্বর লেহ-র নাওয়াং দর্জে স্তোবদান (এনডিএস) স্টেডিয়ামে শুরু হবে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক স্তরের গোলরক্ষক প্রশিক্ষক ম্যাট ডারলোর তত্ত্বাবধানে লাদাখ ও স্পিতির গোলরক্ষকেরা প্রশিক্ষণ নেবেন। এর পাশাপাশি লেহ, দেরাদুন এবং গুরুগ্রামে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রশিক্ষকেরা এক প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা করবেন।
লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত চলবে প্রাথমিক স্তরের ‘লার্ন টু প্লে’ প্রশিক্ষণ। তার পর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আয়োজন করা হবে রয়্যাল এনফিল্ড আইস হকি লিগ এবং স্পিতি কাপ। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এ বার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কোচ এবং রেফারি তৈরির উপরেও।
আইচার গ্রুপ ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বিদিশা দে এই উদ্যোগ নিয়ে বলেন, ‘হিমালয়ের আইস হকি সেই সব সম্প্রদায়ের খেলা, যাঁরা নিজেরা এই খেলায় অংশ নেন। আমাদের দায়িত্ব হল তাঁদের এমন দক্ষ হয়ে উঠতে সাহায্য করা, যাতে তাঁরা নিজেদের মতো করে খেলাটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শীতকালীন ক্রীড়ার মঞ্চে ভারতের ভবিষ্যতের ভিতও তৈরি হবে’।

রয়্যাল এনফিল্ড লিগ ও স্পিতি কাপ
বাঙালির অন্যতম প্রিয় পর্যটন কেন্দ্র লাদাখের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রশাসন এবং আইস হকি অ্যাসোসিয়েশন অফ লাদাখের সঙ্গে যৌথ ভাবে আয়োজিত হয় রয়্যাল এনফিল্ড আইস হকি লিগ (আরইআইএইচএল)। অন্য দিকে, আইস হকি অ্যাসোসিয়েশন অফ লাহুল-স্পিতির সহযোগিতায় আয়োজিত হয় স্পিতি কাপ। দু’টি প্রতিযোগিতাই রয়্যাল এনফিল্ডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের চতুর্থ বছরে পা দিতে চলেছে।
লাদাখের উঠতি প্রতিভাদের সামনে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছে রয়্যাল এনফিল্ড আইস হকি লিগ। অন্য দিকে, স্পিতি কাপের মাধ্যমে লোসার, লালুং, কিলং, লাহুল এবং সাগনামের মতো প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের মধ্যে এই খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
২০২৬-এর লিগে পুরুষ ও মহিলা—দু’টি বিভাগেই খেলা হয়েছিল। স্পিতি কাপে অনূর্ধ্ব-১৮ ছেলেদের বিভাগও ছিল। লাদাখের লেহ, নুব্রা, চাংথাং, শাম, খারু, দ্রাস, কার্গিল, শাকার চিকতান এবং জান্সকার অঞ্চলের দলগুলি অংশ নেয়। হিমাচল প্রদেশের স্পিতির লাহুল, সেন্টার, পিন, শাম এবং তোদ অঞ্চল থেকেও দল এসেছিল।
রয়্যাল এনফিল্ড আইস হকি লিগে ১১টি পুরুষ এবং পাঁচটি মহিলা দল খেলেছিল। প্রথম বার দল নামিয়েছিল খারু। স্পিতি কাপে সিনিয়র পুরুষ বিভাগে প্রথম বার অংশ নেয় লাহুল। পুরুষ বিভাগে হুমাস ওয়ারিয়র্স এবং মহিলা বিভাগে শাম ঈগলস চ্যাম্পিয়ন হয়। স্পিতি কাপে পুরুষ ও মহিলা—দু’টি বিভাগেই খেতাব জেতে সেন্টার জোন। অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় শাম জোন।
হিমালয়ের সংস্কৃতির সঙ্গেও যোগ
রয়্যাল এনফিল্ডের সামাজিক উদ্যোগ শুধু আইস হকির মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। আগামী ৩ থেকে ৯ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির ত্রিবাঙ্কুর প্যালেসে আয়োজন করা হবে ‘জার্নিয়িং অ্যাক্রস দ্য হিমালয়াস’-এর তৃতীয় সংস্করণ। হিমালয়ের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং তাঁদের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরাই এই উৎসবের উদ্দেশ্য। সেখানে আইস হকির জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও থাকবে। লকার রুমের আদলে তৈরি পরিসরের মাধ্যমে দর্শকেরা এই খেলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
হিমালয়ের বরফে ঢাকা প্রত্যন্ত জনপদে আইস হকিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলা এবং স্থানীয় প্রতিভাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়াই রয়্যাল এনফিল্ডের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন নয়, স্থানীয় মানুষের হাতেই খেলাটির ভবিষ্যৎ তুলে দিতে চায় এই সংস্থা। যা হয়তো বিশ্ব আইস হকির মানচিত্রে পরবর্তী কালে ভারতকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে।




