• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 5 November, 2026

ব্যাংক ডুবে যাওয়ায় রাতারাতি ভিখারি দেশের অর্ধেক মানুষ, ইমপিচমেন্টের মুখে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়েতে 'উয়েনো ব্যাংক'-এর (Ueno Bank) পতনের জেরে এক ভয়াবহ আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩০ লক্ষ গ্রাহকের আমানত এবং বিপুল অঙ্কের সরকারি তহবিল আটকে পড়ায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিক্ষোভ। ব্যাংকের সাথে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার (Santiago Peña) অতীত ব্যবসায়িক যোগসাজশের অভিযোগ ওঠায়, তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের প্রস্তাব এনেছে বিরোধী দলগুলো।

ব্যাংক ডুবে যাওয়ায় রাতারাতি ভিখারি দেশের অর্ধেক মানুষ, ইমপিচমেন্টের মুখে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট

Paraguay opposition seeks president’s removal over banking crisis (Image: X/@KatriielEscobar)

একটি দেশের অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর হতে পারে এবং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কর্পোরেট যোগসাজশ কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে পথে বসিয়ে দিতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে বর্তমান প্যারাগুয়ে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ‘উয়েনো ব্যাংক’-এর (Ueno Bank) আকস্মিক পতন প্যারাগুয়েকে কেবল চরম আর্থিক খাদের কিনারায় দাঁড় করায়নি, বরং প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার রাজনৈতিক অস্তিত্বকেও চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে।

ডুবে গিয়েছে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার

উয়েনো ব্যাংকের এই ধস কোনও সাধারণ ঘটনা নয়। এর ফলে প্যারাগুয়ের প্রায় ৩০ লক্ষ গ্রাহক অর্থাৎ দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ,  রাতারাতি পথে বসেছেন। তাঁরা তাঁদের নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা তুলতে পারছেন না। শুধু সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ই নয়, ব্যাংকে আটকে গেছে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের বিপুল পরিমাণ সরকারি তহবিল, যার মধ্যে রয়েছে পাবলিক পেনশন ফান্ডের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতের টাকা। সাধারণ মানুষ যখন দেখছে তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় এবং অবসরের টাকা চরম অনিশ্চয়তার মুখে, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছে গোটা দেশ। রাস্তায় নেমে এসেছে লাখো জনতা।

কাঠগড়ায় খোদ প্রেসিডেন্ট

এই আর্থিক কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বিস্ফোরক দিকটি হলো, খোদ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি যোগসাজশের অভিযোগ। বিরোধী দল এবং তদন্তকারীদের দাবি, উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার অতীত ব্যবসায়িক সম্পর্ক (past stake/holdings) ছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদেই ব্যাংকটি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একের পর এক আর্থিক অনিয়ম করেছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো (regulatory bodies) ইচ্ছে করেই চোখ বন্ধ রেখেছিল।

পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো যে, তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রধান কারভালোকে (Carvallo) খোদ প্রেসিডেন্টের নির্দেশেই পদত্যাগ করতে হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, প্রেসিডেন্ট পেনা, কারভালো এবং উয়েনো ব্যাংকের কর্তাদের এই অশুভ আঁতাতের কারণেই সাধারণ মানুষের আজ এই দশা।

গ্রেপ্তার, তদন্ত এবং ইমপিচমেন্টের খাঁড়া

এই বিশাল আর্থিক জালিয়াতির ঘটনায় প্যারাগুয়ের প্রসিকিউটররা ইতিমধ্যেই ব্যাংকের ৮ জন শীর্ষ কর্তা ও ডিরেক্টরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাটি এসেছে প্যারাগুয়ের পার্লামেন্ট থেকে। বিরোধীরা একজোট হয়ে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার বিরুদ্ধে ‘ইমপিচমেন্ট’ (Impeachment) বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব এনেছে। তারা দাবি করেছে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যাংকের যোগাযেগ রয়েছে। ফলে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) তৈরি হয়েছে। এমন কোনও ব্যক্তির হাতে দেশের অর্থনীতি নিরাপদ নয়।

ভবিষ্যৎ কী?

প্যারাগুয়ের সেন্ট্রাল ব্যাংক বর্তমানে উয়েনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। তারা সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে, এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের সমস্যা এবং দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি তলানিতে ঠেকেছে।

প্রেসিডেন্ট পেনার সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে বিরোধী দলগুলোর ইমপিচমেন্টের চাপ, অন্যদিকে রাস্তায় ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভ এবং সর্বোপরি দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর থেকে উবে যাওয়া বিশ্বাস, সব মিলিয়ে পেনার গদি এখন কার্যত সুতোর ওপর ঝুলছে। এই সংকট কেবল একটি ব্যাংকের পতন নয়, এটি প্যারাগুয়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির এক ভয়ংকর রূপকে প্রকাশ্যে এনেছে। সামগ্রিকতার নিরিখে বলাই যায়, আরেকটি দেশেও অপ্র্ত্যাশিত ভাবে রেজিম চেঞ্জ বা পালাবদল ঘটতে চলেছে।