২০২১ সালের নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬-এ ভারত পরিবেশের কল্যানে জীবাস্ম জ্বালানি থেকে অজীবাশ্ম এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য অর্থাৎ সবুজ বা পরিস্কার জ্বালানি ব্যবহারের দিকে রূপান্তরের যে অঙ্গীকার করেছিল তার কতটা ভারত এপর্যন্ত অর্থাৎ তুরস্কের আন্তালিয়ায় আগামী ৯ নভেম্বর থেকে যে কপ-৩১ সম্মেলন হতে চলেছে তার আগে পর্যন্ত করতে পেরেছে সেটা একটু দেখা দরকার। সেইসঙ্গে এই কাজে ভারতের সামনে প্রধান সমস্যাগুলো কী তাও জানা দরকার।
পুনর্নবীকরণ যোগ্য শক্তির প্রসারে ভারত উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার উপর নির্ভরতা এখনও বড় বাধা। উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রেখে ভারত চাইছে এক ন্যায়সঙ্গত ও সুলভ জ্বালানি রূপান্তর। যে রূপান্তর এর সামাজিক দিকগুলোর দিকেও নজর দেবে।
গ্লাসগোর কপ-২৬ এ ভারত যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছিল, তা দেশের জ্বালানি নীতির ক্ষেত্রে এক নতুন দিশা দেখিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গ্লাসগো সম্মেলনে এটির ঘোষণা করেন যা ‘পঞ্চামৃত’ নামে পরিচিত। এর মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা ক্রমশ কমিয়ে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য অজীবাশ্ম শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা।
গ্লাসগোতে ভারত ঘোষণা করেছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৫০০ গিগাওয়াট অজীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। একই সময়ের মধ্যে দেশের মোট শক্তির চাহিদার ৫০ শতাংশ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্য নেওয়া হয়। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য মোট কার্বন নিঃসরণ এক বিলিয়ন টন কমানো, ২০০৫ সালের তুলনায় অর্থনীতির কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৪৫ শতাংশ হ্রাস এবং ২০৭০ সালের মধ্যে নিট-জিরো নিঃসরণ অর্জনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
গ্লাসগোর পর গত কয়েক বছরে ভারত সৌর ও বায়ুশক্তির প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট অ-জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮৩.৪৬ গিগাওয়াটে। এটি দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৫১.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ২০৩০ সালের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ভারত নির্ধারিত সময়ের আগেই অতিক্রম করেছে।
এই অগ্রগতির পিছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা সৌরশক্তির। ২০২৬ সালের মার্চে ভারতের স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল প্রায় ১৫০.২৬ গিগাওয়াট। বায়ুশক্তির ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রায় ৫৬.০৯ গিগাওয়াট। পাশাপাশি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ, ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস এবং পারমাণবিক শক্তিও দেশের অ-জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।
এই সাফল্য অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র প্রায় ২৯.২ শতাংশ এসেছিল অজীবাশ্ম উৎস থেকে। অন্যদিকে, কয়লা এখনও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস। অর্থাৎ সৌর ও বায়ুশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কয়লার গুরুত্ব এখনও অনেক বেশি।
ভারতের জ্বালানি রূপান্তরের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কয়লার উপর নির্ভরতা কমানো। ভারত এখনও উন্নয়নশীল অর্থনীতি। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পরিকাঠামো নির্মাণ এবং সাধারণ মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কয়লাকে অবিলম্বে পরিত্যাগ করা ভারতের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বহু মানুষের জীবিকা কয়লা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
এই কারণেই ভারত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করার জন্য সব দেশের ক্ষেত্রে একই সময়সীমা বা অভিন্ন নীতি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে। ভারতের বক্তব্য, প্রতিটি দেশের আর্থিক সামর্থ্য, উন্নয়নের স্তর, জ্বালানির চাহিদা এবং সামাজিক বাস্তবতা অনুযায়ী জ্বালানি রূপান্তরের পথ নির্ধারিত হওয়া উচিত।
ভারতের বর্তমান অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর। এর অর্থ শুধু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌর বা বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো নয়। এই পরিবর্তনের ফলে যাঁরা কর্মহীন হবেন, যে অঞ্চলগুলির অর্থনীতি কয়লা শিল্পের উপর নির্ভরশীল, তাঁদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করাও সমান জরুরি।
ভারত মনে করে, কয়লাখনি ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নতুন শিল্প স্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ যেসব কর্মী প্রথাগত জ্বালানি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা আছেন, দক্ষতার পুনঃপ্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কিভাবে সবুজ জ্বালানি উৎপাদনের কাজে লাগানো যায়। বিদ্যুতের দাম যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ জ্বালানি রূপান্তরের বোঝা যেন শুধু শ্রমিক, দরিদ্র মানুষ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর এসে না পড়ে। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য। আইআইটি কানপুরের মানবিকী ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. প্রদীপ স্বর্ণকারের মতে ন্যায্য রূপান্তর কেবল কয়লা থেকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিতে যাওয়ার প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়, এটা সেই সেইসব মানুষে প্রশ্ন যাঁদের জীবিকা, পরিচয় আর সামাজিক নিরাপত্তা কয়লাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। খনি বন্ধের আগেই শ্রমিক, অসংগঠিত কর্মী ও খনি-নির্ভর গোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকা এবং সিদ্ধান্তে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে, কপ-এর কোনও জলবায়ু প্রতিশ্রুতিই ন্যায্য হবে না।
গ্লাসগোর অঙ্গীকারের পর ভারত তার জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রাকেও আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩৫ সালের জন্য ঘোষিত সংশোধিত জাতীয় জলবায়ু অঙ্গীকারে বা এনডিসি-র তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য রয়েছে— ২০০৫ সালের তুলনায় অর্থনীতির কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৪৭ শতাংশ কমানো, মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৬০ শতাংশ অজীবাশ্ম শক্তির উৎস থেকে অর্জন করা এবং বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য কার্বন শোষণের ব্যবস্থা করা। ২০৭০ সালের মধ্যে নিট-জিরো নিঃসরণ অর্জনের লক্ষ্যও অপরিবর্তিত রয়েছে।
গ্লাসগো থেকে আন্তালিয়ার পথে ভারতের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার নির্ভরতা এখনও যথেষ্ট বেশি। ফলে ভারতের সামনে এখন প্রধান প্রশ্ন শুধু কতটা সৌর বা বায়ুশক্তি উৎপাদন করা গেল, তা নয়; বরং কীভাবে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।




