• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 2 November, 2026

আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও

প্রশাসনের সক্রিয়তা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন নাগরিকদের সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিবাদ। শব্দবাজির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো বেআইনি বাজি কারখানার বিস্ফোরণ। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার সাধুয়াপোতা গ্রামে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন এক মা ও তাঁর নাবালক সন্তান। তাঁদের ছিন্নভিন্ন দেহের দৃশ্য প্রতিবেশীদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।

আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও

File Photo

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে আসে নানা উৎসব, নানা আনন্দের উপলক্ষ। আর উৎসবপ্রিয় বাঙালির হৃদয়ে উৎসবের আনন্দ যেন একটু বেশিই রঙিন, একটু বেশিই আবেগময়। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস আর ঢাকের বাদ্যি নিয়ে আসে দুর্গাপুজো। তার পরেই লক্ষ্মীপুজো। এরপর আলোর বার্তা নিয়ে অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে আসে দীপাবলি ও কালীপুজো। কোথাও আবার ছটপুজোর ভক্তিময় আবহ, কোথাও জগদ্ধাত্রীপুজোর আলোকোজ্জ্বল আয়োজন। উৎসবের এই রঙিন দিনগুলিতে ঘর থেকে মণ্ডপ, পথ থেকে প্রাঙ্গণ—সবই সেজে ওঠে আলো, আনন্দ আর মিলনের সাজে।

দীপাবলির মূল সুরই হলো অন্ধকারের বুকে আলোর প্রতিষ্ঠা। প্রদীপের ছোট্ট শিখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর কাছে তাকে হার মানতেই হয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে দীপাবলি তাই শুধু আলোকসজ্জার উৎসব নয়; এটি অশুভের বিনাশ, শুভের আবাহন এবং আশা ও আনন্দের প্রতীক। কিন্তু এই আলোর উৎসব যখন শব্দবাজির বিকট আওয়াজ, ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসের দাপটে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটুকু বুঝতে পেরেছি? যে আনন্দ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা, সেই আনন্দই যদি অন্যের কষ্টের কারণ হয়, তবে উৎসবের সার্থকতা কোথায়? প্রতিবছর দুর্গাপুজো ও লক্ষ্মীপুজো শেষ হলেই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শুরু হয় কালীপুজো, দীপাবলি, ছটপুজো ও জগদ্ধাত্রীপুজোর প্রস্তুতি। চারদিকে উৎসবের আবহ। অথচ ক্ষণিকের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে আমরা অনেকেই আতশবাজি ও শব্দবাজি ফাটিয়ে পরিবেশকে দূষিত করি।

একসময় বাজি ফাটানোর দাপট সীমাবদ্ধ থাকত বড়জোর এক-দু’রাতে। এখন উৎসবের আগে-পরে মিলিয়ে সাত-আট রাত ধরে চলে এই অত্যাচার। শুধু রাত নয়, কখনো কখনো দিনের শান্ত পরিবেশও কেঁপে ওঠে শব্দবাজির তীব্র আওয়াজে। কিছু মানুষের অসংযত আনন্দ অন্য অনেকের কাছে হয়ে ওঠে দুঃসহ যন্ত্রণা। লেখকের পাঁচ বছরের নাতনি বাজির শব্দ শুনলেই আঁতকে ওঠে। মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কান্নাকাটি করে, রাতে ঘুমোতে পারে না। আবার নব্বই বছরের বৃদ্ধা মায়ের শ্রবণশক্তিও শব্দদূষণের কারণে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি পরিবারের নয়; আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অসুস্থ মানুষ রয়েছেন, যাঁদের কাছে বাজির শব্দ আনন্দের নয়, আতঙ্কের। যাঁরা হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি কিংবা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, তাঁদের জন্যও এই সময়টা যথেষ্ট কষ্টকর।

কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর আমরা জানি, শ্বাসতন্ত্রের সুস্থতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পরও অনেকের শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা থেকে যায়। বায়ুদূষণের সঙ্গে যুক্ত হয় বাজির ধোঁয়া; ফলে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। শুধু মানুষ নয়, আমাদের চারপাশের জীবজন্তুরাও এই অত্যাচারের শিকার। কুকুর, বেড়ালসহ বহু প্রাণী শব্দবাজির তীব্র আওয়াজে ভয় পায়, দিশাহারা হয়ে ছোটাছুটি করে। এমনকি কিছু নিষ্ঠুর মানুষ তাদের গায়ে জ্বলন্ত বাজি ছুড়ে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়। উৎসবের নামে এই নিষ্ঠুরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আনন্দের সঙ্গে সহমর্মিতা, উৎসবের সঙ্গে মানবিকতা— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই তো প্রকৃত আনন্দ।

কালীপুজো ও দীপাবলিতে শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি নির্দেশিকা ও আইন রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলির যথাযথ প্রয়োগ হয় না। পুলিশ-প্রশাসনের উদাসীনতা, নজরদারির অভাব এবং সাধারণ মানুষের নীরবতা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে। ভয়ে কিংবা অযথা ঝামেলায় জড়ানোর আশঙ্কায় অনেকেই প্রতিবাদ করতে চান না। ফলে আইন অমান্যকারীরা আরও সাহস পেয়ে যায়। অথচ মনে রাখা দরকার, অন্যের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অধিকার কারও নেই। প্রশাসনের সক্রিয়তা যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন নাগরিকদের সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিবাদ। শব্দবাজির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো বেআইনি বাজি কারখানার বিস্ফোরণ। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার সাধুয়াপোতা গ্রামে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে একটি বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন এক মা ও তাঁর নাবালক সন্তান। তাঁদের ছিন্নভিন্ন দেহের দৃশ্য প্রতিবেশীদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।

এগরার খাদিকুল গ্রামের বাজি কারখানার বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত নয়জন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বজবজে বাজি বিস্ফোরণ এবং পরে উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা আমাদের আবারও নাড়িয়ে দিয়েছিল। এমন কত দুর্ঘটনায় কত অসহায় মানুষের প্রাণ ঝরে যায়, তার সম্পূর্ণ হিসাব আমাদের জানা নেই। কেন বারবার ঘটে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা? এর পিছনে রয়েছে বেআইনি উৎপাদন, নিরাপত্তাবিধি না মানা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি। পাশাপাশি রয়েছে দারিদ্র্য ও জীবিকার কঠিন বাস্তবতা। গ্রামগঞ্জের বহু মহিলা ও শিশুশ্রমিক অল্প মজুরিতে বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়। কাজের অভাব, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সংসারের অন্নসংস্থানের তাগিদে তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও এই কাজে যুক্ত হন। তাই শুধু কারখানা বন্ধ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বেআইনি বাজি উৎপাদন বন্ধ করার পাশাপাশি এই শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসন, পঞ্চায়েত, স্থানীয় মানুষ এবং সামাজিক সংগঠনগুলিকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

বাজির বাজারে নিষিদ্ধ শব্দবাজির অবাধ প্রবেশ বন্ধ না হলে শুধু ক্রেতাকে সচেতন করে পরিস্থিতির পরিবর্তন করা কঠিন। দোকানের সামনে সবুজ বাজি সাজিয়ে রেখে আড়ালে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রির অভিযোগও শোনা যায়। গ্রামগঞ্জ ও শহরতলিতে বেআইনি বাজি তৈরির সঙ্গে কারা যুক্ত, সে সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের অনেকেরই ধারণা থাকে। তাই প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বেআইনি কারখানা বন্ধ করা, নিয়মিত নজরদারি চালানো এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, নীরবতা অনেক সময় অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। শুধু নিজের হাতে বাজি না ফাটালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। আশপাশের মানুষকেও বোঝাতে হবে, প্রয়োজনে আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত অসহায় শ্রমিকদের বিকল্প জীবিকার পথ দেখানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ পরিবেশ রক্ষা, মানুষের জীবন বাঁচানো এবং জীবজন্তুর প্রতি সহমর্মিতা— সবই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

দীপাবলি হোক আলোর, ভালোবাসার এবং মানবিকতার উৎসব। আমাদের ঘর সাজুক প্রদীপ, মোমবাতি ও বৈদ্যুতিক আলোর রোশনাইয়ে। উঠোনে জ্বলুক মাটির প্রদীপ, জানালায় ফুটে উঠুক আলোর মালা, আর হৃদয়ে জেগে উঠুক পরের দুঃখ বোঝার কোমল অনুভূতি। শব্দবাজির বিকট আওয়াজের বদলে ভেসে আসুক মানুষের হাসি, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার কথা। উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মধ্যে— শিশুর নিশ্চিন্ত ঘুমে, বৃদ্ধের শান্ত সন্ধ্যায়, অসুস্থ মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাসে এবং অবলা প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়ে। আসুন, আমরা এবার সত্যিই আলোর উৎসব পালন করি। বাইরের অন্ধকার দূর করার পাশাপাশি মনের অন্ধকারও মুছে ফেলি। হিংসা, নিষ্ঠুরতা, উদাসীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার অন্ধকার সরিয়ে জ্বালিয়ে তুলি বিবেকের প্রদীপ।