ভারত স্বাধীন হয়েছে প্রায় আশি বছর আগে। তবু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও নানা বিশেষ প্রকল্প ও সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বাসস্থান কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা— কোনও ক্ষেত্রেই সারা দেশে সমান পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এমন অবস্থায় শুধু প্রতিযোগিতার ময়দানটি সবার জন্য খুলে দিলেই কি সমান ফল পাওয়া সম্ভব? গাছের গোড়ায় জল না দিয়ে শুধু আগায় জল ঢাললে যেমন গাছ বাঁচে না, তেমনই শৈশব থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতি থেকে গেলে পরবর্তী জীবনে একই সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে থাকা মানুষকে অনেক দূর থেকে দৌড় শুরু করতে হয়। তাই সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবি কতখানি যুক্তিযুক্ত, তা ভাবার আগে রাষ্ট্রের দায়িত্বটি কোথায় শেষ হচ্ছে, সেই প্রশ্নও করা দরকার। শুধু আসন বা সুযোগের ব্যবস্থা নয়, প্রত্যেক শিশুকে এমন ভাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে পরবর্তী জীবনের প্রতিযোগিতায় সে নিজের সামর্থ্যেই লড়াই করতে পারে।
পাশাপাশি এও সত্যি যে, পিতা-মাতার অতিরিক্ত প্রত্যাশা, নম্বরের জন্য ক্রমাগত চাপ এবং প্রতিযোগিতার বোঝা অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছে শিক্ষাকে আনন্দের বদলে ভার করে তুলছে। ফলে বই ও শিক্ষার প্রতি অনীহাও বাড়ছে। শিক্ষাকে জীবনের বাহন করে তোলার বদলে আমরা যেন তাকে কেবল বহন করেই চলেছি। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার আলোকে এই প্রবণতাটিকেও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
পাশাপাশি, দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসকে অস্বীকার না করে সকলকে যতটা সম্ভব সমকক্ষ অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টাই হওয়া উচিত শিক্ষানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কেবল কিছু আসন নির্দিষ্ট করে রাখা নয়, ঐতিহাসিক ভাবে বঞ্চিত মানুষের সামনে শিক্ষা ও অগ্রগতির পথ খুলে দেওয়া এবং দীর্ঘ দিনের বৈষম্যের কিছুটা প্রতিকার করাও তার লক্ষ্য। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সময় কোনও ছাত্র বা ছাত্রীর জ্ঞান, ভাষা, বিশ্লেষণক্ষমতা কিংবা বিষয়ভিত্তিক ভিত যদি অন্যদের তুলনায় দুর্বল থাকে, তবে একই শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগটিই যথেষ্ট নাও হতে পারে। একটি শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্কুলের মান, শিক্ষার পরিবেশ, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য এবং পড়াশোনায় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ— সব কিছুই তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করে। তাই উচ্চশিক্ষার দরজায় এসে কেবল সংরক্ষিত আসন পেলেন কি না, অথবা পরীক্ষায় কে বেশি নম্বর পেলেন, সেই প্রশ্নে আটকে থাকলে বৈষম্যের গোড়ার কারণ আড়ালেই থেকে যায়।
‘মেধা’ নিয়েও তাই আরও সূক্ষ্ম ভাবে ভাবা প্রয়োজন। সঙ্গতিময় পরিবারের ছাত্রছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই ভাল স্কুল, অতিরিক্ত ক্লাস, ব্যক্তিগত শিক্ষক কিংবা ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতে পারেন; আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের পক্ষে সেই সুবিধা অনেক সময় অধরাই থাকে। ফলে পরীক্ষার ফলকে ছাত্রটির ব্যক্তিগত যোগ্যতার একমাত্র প্রতিফলন হিসাবে দেখা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার সংরক্ষণের মাধ্যমে কোনও ছাত্র বা ছাত্রী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করলেই যে তাঁর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সব ঘাটতি মিটে যায়, এমনও নয়। সংরক্ষণ তাই একটি বৃহত্তর সামাজিক নীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন— যার সঙ্গে স্কুলশিক্ষার মানোন্নয়ন, পুষ্টি, ভাষাশিক্ষা, বিষয়ভিত্তিক ভিত তৈরি এবং প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা যুক্ত থাকবে।
উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সহজলভ্য মানসিক পরামর্শ, শিক্ষক বা পরামর্শদাতার নিয়মিত যোগাযোগ, শিক্ষাগত সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। জাতপাত, ভাষা, আর্থিক অবস্থান বা অন্য কারণে হেনস্থা বা বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্তও প্রয়োজন। সংরক্ষিত শ্রেণির কোনও ছাত্র যদি জাতপাতের পরিচয়ের জন্য অপমান, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন, তবে তা শুধু ওই ছাত্রটির অপমান নয়, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ এবং সমতার আদর্শেরও অবমাননা। অবশ্যই কোনও একটি ঘটনা বা অভিযোগের ভিত্তিতে গোটা ছাত্রসমাজ কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা অনুচিত। কিন্তু জাতপাতের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ যখন বার বার সামনে আসে, তখন তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও সমান ভাবে অনুচিত।
প্রতিটি এমন মৃত্যুর পরে ছাত্রসমাজে প্রতিবাদ হয়, সামাজিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কখনও তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরে আলোচনার তীব্রতা কমে যায়, আর কিছু সময় পর সামনে আসে আর একটি মর্মান্তিক ঘটনা। এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে উদ্বেগের।
তবে, অসাম্যের ক্ষত যে সব উপায়ে প্রকাশ পায়, তার অন্যতম হল খিদে। ভারত এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি, কখনও কখনও পঞ্চম বা চতুর্থ স্থানেরও দাবিদার হয়েছে। কিন্তু ক্ষুধার সূচকে ভারতের স্থান নিরানব্বইটি দেশের পিছনে। গত বছরের অবস্থান (১০২) থেকে খানিক উন্নত বটে, কিন্তু এখনও ‘গুরুতর ক্ষুধা’ শ্রেণির বাইরে বেরোতে পারেনি ভারত।
যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই সূচক প্রকাশ করে, তাদের পরিমাপ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভারতের ‘স্কোর’ ২০০০ সালে ৩৮.১ থেকে ২০২৬ সালে ২৪.১-এ এসেছে। শ্রীলঙ্কা একই সময়ে ২১.৪ থেকে উন্নীত হয়েছে ১০.৪ অবস্থানে, চিন ১৩.৪ থেকে পাঁচেরও নীচে। যা ফের স্পষ্ট করে, বিশ্বায়িত অর্থনীতির সুবিধে ভারতের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অতি মন্থর গতিতে অতি সামান্য পরিবর্তনকে ‘উন্নতি’ বলা চলে না, বিশেষত যেখানে বিলম্বের মূল্য চোকাতে হচ্ছে শিশুদের। ২০২৬ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচক মেপেছে চারটি বিষয়— অপুষ্টি, শিশুদের খর্বাকৃতি (স্টান্টিং), শিশুদের দৈর্ঘ্যের তুলনায় ওজনে ঘাটতি এবং পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের মৃত্যুহার। ফলাফলে প্রকাশ, ভারতে জনসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে; পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের ২৯ শতাংশ অপুষ্টির ফলে খর্বাকৃতি, ১৯ শতাংশ শিশু রোগা— অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের তুলনায় তাদের ওজন কম, এবং ২.৭ শতাংশ শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যায়।
২০০০ সালে শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৫০ শতাংশ ছিল। তা ছাড়া তিনজনে একজন শিশু অপুষ্ট, এ ছবিও স্বস্তিকর নয়। অপুষ্টির এই লজ্জাজনক ছবি তুলে ধরলেই সরকারের তরফে দেওয়া হয় কিছু পাল্টা পরিসংখ্যান— ৮০ কোটি নাগরিক রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুলভে চাল-গম পাচ্ছে, শিশুরা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে খাবার পাচ্ছে, স্কুলে মিড-ডে মিল পাচ্ছে, ইত্যাদি। এ ভাবে শিশুর দৈহিক-মানসিক বৃদ্ধির প্রশ্নটিকে কেবলমাত্র কয়েকটি প্রকল্পের পরিধিতে টেনে আনা হয়। তাতে আড়ালে পড়ে যায় পরিবারের কর্মহীনতা, কাজের অনিশ্চয়তা, সামান্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। অথচ, শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার পেল কি না, তা প্রধানত এগুলির উপরেই নির্ভর করে। বিশেষত দরিদ্র মাকে সামান্য আয়ের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হলে তা শিশুর জীবনে নানা ভাবে ছাপ ফেলে যায়।
রোজগারে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে, আয়বৃদ্ধিকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবারের উপর এগুলির অভিঘাত সামাল দিতে পারছে না সরকারি প্রকল্প। নীতি আয়োগ শিশু পুষ্টির প্রধান নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে দারিদ্র, আয়ের অসম বণ্টন, মায়ের শিক্ষার হার এবং নারীর সামাজিক অবস্থানকে। কিন্তু পুষ্টি-বিধানের সরকারি উদ্যোগে এই সামগ্রিক চিন্তার ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অতএব ফের প্রশ্ন করা দরকার, খাদ্য জোগানোর প্রকল্পগুলি দীর্ঘ দিন চলার পরেও কেন শিশু-অপুষ্টির চিত্রে পরিবর্তন আসেনি?
মিড-ডে মিলে বাড়তি বরাদ্দের আস্ফালন যথেষ্ট নয়, সেই বরাদ্দে শিশুর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফল, আনাজপাতি থাকছে কি না, শিশুরা দিনে একবার সুষম আহার পাচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি দীর্ঘ দিন অবহেলিত। পরিকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন, মা ও শিশুর জন্য রুচিকর, পুষ্টিকর খাবারের জন্য যথেষ্ট টাকা বরাদ্দ করা দরকার। নজর দেওয়া দরকার নিরাপদ পানীয় জল, শৌচ-নিকাশি ব্যবস্থার দিকে, কারণ ঘন ঘন পেটের রোগ অপুষ্টির অন্যতম কারণ। নজর দাবি করে প্রান্তিক, বৈষম্য-পীড়িত জনগোষ্ঠীগুলি। দলিত, মুসলিম বা জনজাতি-প্রধান গ্রাম, ভাটা, খনি বা খাদান-সংলগ্ন এলাকা, বন্ধ বাগান ও কারখানা-সংলগ্ন পরিবার, পরিযায়ী শ্রমিক, অনিশ্চিত জীবিকার উপর নির্ভরশীল পরিবারের শিশুদের যত্নের প্রয়োজন। টাকার অঙ্ক নয়, ‘যত্ন’-ই হয়ে উঠতে হবে সরকারি উদ্যোগের পরিমাপ।




