‘বিষ্ণুলোক’ দোকানের পিছনে আমগাছটাই অন্ধ জনের আলো| প্রেমে অন্ধ বোকা-প্রেমিকের দল টিফিন সময় জটলা পাকায় দু’তলায় প্রত্যাশী দৃষ্টিতে চেয়ে| পাশে চিড়িয়াখানার মতো সাজানো বাগানে বিনা পেখমের এক ময়ূর খুঁজে বেড়ায় তার রঙিন পালক গুলো| এ জীবনে রঙটাই ফেলেছে হারিয়ে মেঘের গর্জনে| ব্যারাকপুরের কল্যাণী স্কুল এমনিতে বেশ সচেতনী, মুক্তমনা| মুক্ত চিন্তা ধারা বিকাশের সুযোগ ছাত্র-ছাত্রীরা পায় বেশ| সেই গুরুকুলে প্রত্যেক ‘মেঘা’র জন্য যেমন ‘রাজ আরিয়ান’রা রয়েছেন, তেমন পিতৃবৎসল নারায়ণ শঙ্করের ভূমিকায় বচ্চনের মতোই দীর্ঘকাল সুপুরুষ প্রিন্সিপাল হরিমহারাজ|
আন্দামানের সেলুলার জেলে ব্রিটিশ জেলারের মত টহল দেন টিফিন ঘণ্টা বাজার পরে কে বাইরে আছে দেখার জন্য| তবে তার মধ্যেই গেম ওভার| আম গাছের তলা থেকে একের পর এক টেস্ট টিউবে ভরা চিঠি বাতাসে ভাসতে ভাসতে উড়ে যায় মেয়েদের ক্লাস রুমের দিকে| সম্বিতের খেলনা মনের প্রতিফলন টেস্টটিউব বিমান সেভাবেই উড়ে গিয়েছিল অর্পিতার জন্য|
কিন্তু এয়ার টার্বুলেন্সে গোত্তা খেয়ে ঘুরে এসে পড়ে পি. বি. স্যারের চরণতলে| তিনি এক্স আর্মি ম্যান, অন্তত না হলেও বলে তো তাই লোকে| তিনিও গ্রহণ করেন অম্লান বদনে| হাতের বেত শংসাপত্র| মুহূর্তে প্রাণ বাঁচাতে বন্ধু সম্বিতের সাহায্যে আসা গোপ-গোপিনীদের রুদ্ধশ্বাস পলায়ন| সম্বিতের আজ শিরে সংক্রান্তি না মকর সময় বলবে| বারান্দা ছাড়তে ছাড়তে অর্পিতার লাজুক চোখ একবার খুঁজে নিল কাকে?
ক্লাসরুমে শুধু পিন গেল, বুলডোজার ড্রপ সাইলেন্স| টিফিনের ঘন্টাধ্বনি থেমে গেলেও পি বি স্যারের আবহ সংগীত বাজছে সকলের হৃৎপিণ্ডদ্রুম! ‘সম্বিৎ কোথায়? এদিকে আয়!’ থাট্টিয়ে একটা চড় মেরে স্যার বললেন, ‘যেদিন এতটা কল্পনা করে প্রেম পত্র লিখতে পারবি, সেদিন আর আমার ক্লাস করবি না! তোকে ছেড়ে দেব, যদি এখনই বলিস এই চিঠি কে লিখেছে?’ লজ্জায় অপমানে চুপ থাকে সম্বিত, গর্জন করে স্যরের বেত বেদান্তের অমৃত বাণীর মত! চুরিবিদ্যা মহান যদি না পড়ো ধরা| লজ্জায় সে আর্তনাদ পর্যন্ত করে না|
‘আমি লিখেছি স্যার!’ সায়নের আর কোনও গত্যন্তর রইল না| বন্ধুর জন্য পিতৃপুরুষের ব্যবসা জলে দিতে হল| পিতৃপুরুষই বটে| ক্লাস ফাইভ সিক্সে পুরুলিয়া সৈনিকে ভর্তির জন্য যেরকম ট্রেনিং দিয়েছিল দাদু, সেই পিএইচডির থিসিস পেপার ভাঙ্গিয়ে চলছে ক্লাস নাইন| “বন্ধুর জন্য প্রেম পত্র লিখছো? সেখানে এভাবে রবীন্দ্রনাথ! এতো বিয়েতে ঘটকালি! তা হঠাৎ ‘মাল্যদান’ গল্পটাই বেছে নিলে কেন? সেখানে তো কুড়ানি তার প্রেমকে পায়নি জীবনে!” এক্স আর্মি অফিসারের দিকে এবার প্রেমের মেশিন গান চালায় সায়ন, ‘আপনি গল্পটা বঝেননি স্যার! কুড়ানি সেই এক রাত্রে যে মালাটা পেয়েছিল, অনেক মেয়েরা সারা জীবন সংসার করেও পায় না!’
চমকে উঠে স্যার! কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বলে, ‘আজ আর পড়াবো না, যা তোদের ছুটি!’ মনে মনে হয়তো তার জীবনের কোনও ব্যর্থ মধুবালার ছবি আঁকে| সায়নের তাতে কাজ নেই, মেয়েদের ঘরেও বাতাসে ভেসে চিঠি ধরা পড়ার গল্প পৌঁছেছে| অর্পিতা সায়নের লেখার ভাষা চেনে| একবার অন্য কারোর থেকে জেরক্স করেছিল সে সায়নের ক্লাস নোট| আর সেই থেকে বিপত্তি| সারা স্কুল হয়ে উঠলো রবীন্দ্রনাথের মাল্যদান গল্পের পটল| সব শুনে শুনে অর্পিতাও অপেক্ষায় থাকে, লেখক কবে স্বনামে আসবে তার সামনে| সায়নের কাছে লেখাটাই ছিল বড়|
ভাষা পাল্টে পাল্টে বিভিন্ন বন্ধুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে সে লিখে দিত প্রেমপত্র। ক্লাস নাইনের ডক্টর জিভাগো! জার তন্ত্রের রাশিয়াতে প্রেমের মুক্ত বাতাস! কিন্তু সে শুধু নিজেকেই ভালোবাসে, লেখক হয়ে উঠতে চায়| অবশ্য বন্ধুদের কাছে বিনিময়ে প্রফেশনাল ফিস ছাড়ে না| অর্পিতার ভাগ্য, চরিত্র কোনটাই কুড়ানির মত ছিল না| অনেকবার স্কুল বাসে ওঠার আগে সায়নকে সে প্রশ্ন করেছে, ‘সত্যি চিঠিগুলো তুই এমনি লিখিস?’ তিন সত্যি করে জীবনের সবথেকে প্রিয় মানুষটা সম্পর্কে দিব্যি কেটেও বলেছে সায়ন| কিন্তু পটলের মত বন্ধু-বান্ধবরা ঠাট্টা মশকরার তুলা যন্ত্রে মিথ্যেকেই করেছে ওজনে ভারী|
অর্পিতা কুড়ানি নয়, সেও আর অপেক্ষা করেনি| তবে মনের কোণে কোনও এক বুক-সেলফে স্মৃতির ফটোস্ট্যান্ডে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল সায়নের নাম| প্রায় কুড়ি বছর পর, দূর থেকে সায়নকে দেখে ছুটে এসেছিল বই হাতে। শুধু এইটুকু বলার জন্য, ‘জানতাম, আর কিছু না হোক, লেখাটা তোর হবে!’ রবীন্দ্রনাথের মাল্যদান গল্পে এমন কি আছে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রেমের ভাষা হয়ে থাকে? সেই উৎস সন্ধানে আমাদের সাহিত্যে অবগাহন |……

একটি শুকনো বকুলের মালা। সময়ের সঙ্গে তার ফুলগুলি শুকিয়ে গিয়েছে, হারিয়েছে তাজা গন্ধ। অথচ কারও কাছে সেই মালাই হয়ে উঠতে পারে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। যৌবন হারানো বার্ধক্যের সেই ফুলের মালায় ছিল প্রেমের স্বীকৃতি, জীবনের মূল্য তার কাছে তুচ্ছ| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মাল্যদান’ গল্পে এই সামান্য বকুলমালাই যেন এক কিশোরীর না-বলা ভালোবাসার নীরব সাক্ষী, মৃত্যুর আগে পেয়েছিল স্বীকৃতি|
গল্পের কুড়ানিকে প্রথম দেখলে মনে হয়, সে যেন এই জটিল পৃথিবীর কেউ নয়। বয়স ষোলো, অথচ মনের ভিতর এখনও শৈশবের সরলতা। পটলের সংসারে সে স্নেহ পেয়েছে, আশ্রয় পেয়েছে, কিন্তু জীবনের অনেক পরিচিত অনুভূতির সঙ্গে তার এখনও ঠিক পরিচয় হয়নি। লজ্জা কী, প্রেম কী, কাউকে হারানোর ভয় কতখানি—এসবের অর্থ তার কাছে তখনও অস্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ কুড়ানিকে বনের হরিণীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মধ্যে আছে এক সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য, এমন এক নিষ্পাপ ভাব যা তার স্বতন্ত্র। সে যেন নিজের অজান্তেই শরীরে মনে বড় হয়ে উঠছে, অথচ বড় হয়ে ওঠার অর্থটি এখনও তার জানা নেই।
কুড়ানির জীবনে যতীনের আগমন অনুভূতির এক অজানা জগতের উন্মুক্ত জানলা। সে নিজেও বোঝে না, যতীন ডাক্তারের উপস্থিতি কেন তার কাছে এত স্বাভাবিক, অথচ তার অনুপস্থিতির কথা ভাবলেই এক শূন্যতার ভাব গ্রাস করে। পটল তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে, লজ্জা দিতে চায়| কিন্তু কুড়ানির মনের ভিতরে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার গভীরতা কেউ বুঝতে পারে না। কুড়ানিও নয়।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ৫: হৈমন্তীর বাবার আজও রয়েছে টেলিপ্যাথির জোর
মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন কোনও অনুভূতি বেনামি চিঠির মত জমা হয় লাল লেটার বক্সে। আমরা বুঝতে পারি না, কখন একজন মানুষ অন্য সবার চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছেন, কখন তাঁর সামান্য কথাও মনে থেকে যাচ্ছে, কখন তাঁর উপস্থিতি আমাদের অজান্তে জীবনে যোগ করেছে জীবন। কুড়ানির ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটে। যতীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যে যে কোমল আকর্ষণ জন্ম নিচ্ছিল, তা প্রকাশ করার ভাষা তার নেই। সে শুধু অনুভব করে| কিন্তু কী অনুভব করছে, তা জানে না।
এরপর যতীন হঠাৎই তার জীবন থেকে অন্তরিত হয়। আর এই চলে যাওয়াই কুড়ানির জীবনে নামিয়ে আনে তমশাচ্ছন্নতা। যতীন চলে যাওয়ার পর কুড়ানি তার ঘরে গিয়ে দেখে, সবকিছু কেমন ফাঁকা। যে মানুষটির উপস্থিতি এতদিন তার কাছে স্বাভাবিক ছিল, সেই মানুষটির অনুপস্থিতি হঠাৎ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। টেবিলের উপর পড়ে রয়েছে তার দেওয়া মালাটি। কুড়ানি যেন সেই শূন্য ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের এমন একটি সত্য আবিষ্কার করে, যার কথা সে আগে কখনও ভাবেনি।
বাইরে তখন বসন্তের সকাল। চারদিকে আলো, পাখির ডাক, গাছের পাতায় রোদের খেলা। প্রকৃতি নিজের আনন্দে মগ্ন। অথচ কুড়ানির কাছে পৃথিবীটা হঠাৎ কেমন বদলে গেছে। চারপাশে এত প্রাণ, এত উচ্ছ্বাস, তবু তার নিজের ভিতরটা শূন্য। রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় এই বৈপরীত্য বড় মর্মস্পর্শী। প্রকৃতির আনন্দ যেন আরও স্পষ্ট করে তোলে কুড়ানির একাকিত্বকে।
কুড়ানি কাঁদে। কিন্তু কেন কাঁদছে, তা সে নিজেও জানে না। তার বেদনার কোনও নাম নেই, ব্যাখ্যা নেই। সে জানে না, এই অনুভূতি ভালোবাসা কি না| জানে না, পৃথিবীর অন্য মানুষেরাও এমনভাবে কাউকে হারিয়ে কাঁদে কি না। নিজের মনের কথা বলার মতো ভাষা তার নেই। কান্নাই তার একমাত্র অস্ফুট বর্ণমালা ।

এইখানেই রবীন্দ্রনাথের গল্পের সার্থকতা। তিনি কুড়ানির প্রেম সেখানে অব্যক্ত, ভাষা হয়ে ফোটে চুপ কথারা। তার অসহায়তা, নীরবতা আর আচরণের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিয়েছেন, একটি অনভিজ্ঞ হৃদয়ের ভিতরে কীভাবে অজান্তে গভীর অনুভূতির জন্ম হয়। কুড়ানি যতক্ষণ যতীনকে কাছে পেয়েছিল, ততক্ষণ নিজের মনের কথা বুঝতে পারেনি। তাকে হারানোর পরেই সে বুঝতে শুরু করে, মানুষটির উপস্থিতি তার কাছে কতখানি ।
যতীনের চলে যাওয়ার পর কুড়ানি বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। তার ঘরে পড়ে থাকে কাপড়, গয়না, সাজসজ্জার সামগ্রী, এতদিন যে জিনিসগুলি তার পরিচিত জীবনের অংশ ছিল| সেগুলির প্রতি তার আর কোনও আকর্ষণ নেই। এই দৃশ্য যেন বলে দেয়, কুড়ানি আর আগের মত নেই। তার ভিতরে ঘটেছে রূপান্তর |
পরে যতীনের সঙ্গে আবার দেখা হয় কুড়ানির। এই পুনর্মিলনের মুহূর্তে তার মধ্যে আরও একটি পরিবর্তন চোখে পড়ে। যতীনকে চিনতে পেরে তার চোখে জল আসে, মুখে ফুটে ওঠে লজ্জা। সে আড়াল করতে চায় নিজের অনুভূতি। তার গলায় তখনও রয়েছে সেই শুকনো মালা| মালাটি শুকিয়ে গেছে, তবু সে সেটিকে ফেলে দেয়নি। কেনই বা দেবে? যে মানুষটির স্মৃতি তার হৃদয়কে আলোড়িত করছে, তার দেওয়া সামান্য উপহারও তো তখন আর সামান্য থাকে না। সেই মালার মধ্যে জমে থাকে অপেক্ষা, স্মৃতি, অভিমান আর এক প্রাণ ভালোবাসা…
এখানেই ‘মাল্যদান’ নামটির গভীরতা। শুকনো বকুলের মালাটি কুড়ানির কাছে যেন তার নিজের হৃদয়েরই প্রতিচ্ছবি। সে ভালোবাসতে শিখেছে, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা এখনও তার অজানা। সে কাউকে কিছু বলতে পারেনি, তবু তার যত্নে রেখে দেওয়া মালাটি অনেক না-বলা কথা বলে দেয়। কুড়ানির এই পরিবর্তনকে রবীন্দ্রনাথ প্রেমের গল্পে অমর অক্ষয় করে তুলেছেন| এর মধ্যে রয়েছে একটি মানুষের নিজের ভিতরকে চিনতে শেখার কাহিনি। আমাদের জীবনে অনেক অনুভূতি আসে নিঃশব্দে। প্রথমে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় না। পরে বিচ্ছেদ, অভাব, স্মৃতি এই মনের মানুষকে জীবনের বট বৃক্ষ করে তোলে। কুড়ানির ক্ষেত্রেও সেই উপলব্ধি আসে হারানোর মধ্য দিয়ে।
তবে কুড়ানির চরিত্র নিয়ে ভাবতে গেলে তার মানসিক অপরিণত অবস্থাটিও মনে রাখা জরুরি। সে বয়সে তরুণী হলেও অনুভূতি বোঝার অভিজ্ঞতা তার সীমিত। তার পরিবর্তন তাই একদিকে কোমল ও মর্মস্পর্শী, অন্যদিকে বেদনাময়। রবীন্দ্রনাথ তার মনের সব রহস্য ব্যাখ্যা করেননি। ‘মাল্যদান’ পড়তে পড়তে মনে হয়, ভালোবাসার প্রথম পরিচয় কখনও আসে অস্থিরতা হয়ে, কখনও চোখের জলে, কখনও একটি শূন্যতায় ভরা জীবন দর্শনে। সারা জীবন জুড়ে যে প্রেমের সন্ধান, কখনও তা লুকিয়ে থাকে শুকনো ফুলের মালায়| রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ সেই না-বলা অনুভূতিরই গল্প।
মাল্যদান গল্পের আলোচনায় জীবন স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে সায়নের চোখে ভেসে ওঠে অর্পিতার মুখ| কফি হাউসে জানালার পাশে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ছবির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তান-সন্ততির মা অর্পিতা নয়, বিশ বছর আগের সেই প্রত্যাশী সত্তা| সমুদ্র মন্থনে উঠে আসা জীবনের সেই গুরুত্বহীন ঝরাপাতা আর টেস্টটিউব প্রেমের চিঠি, আজকের প্রবন্ধে হঠাৎই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সায়নের কলমে |
দেখুন:




