• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 25 October, 2026

সমাজের বাঁকা চোখ উপেক্ষা করে স্বপ্ন দেখার পাঠ, যৌনকর্মীদের সন্তানদের পাশে ‘আমরা পদাতিক’

যৌনকর্মীদের সন্তানদের অন্ধকার জগৎ থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে সুস্থ জীবন উপহার দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিল ‘আমরা পদাতিক’।

সমাজের বাঁকা চোখ উপেক্ষা করে স্বপ্ন দেখার পাঠ, যৌনকর্মীদের সন্তানদের পাশে ‘আমরা পদাতিক’

যৌনকর্মীদের সন্তানদের অন্ধকার জগৎ থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে সুস্থ জীবন উপহার দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নিল ‘আমরা পদাতিক’। শিশুদের জন্য তাদের তরফে তৈরি করা হয়েছে ডে কেয়ার সেন্টার। সেখানে গত ৮ মাস ধরে এই ডে কেয়ার সেন্টারে পড়াশোনা করছে বাচ্চারা। আর ডে কেয়ার সেন্টার ছাড়াও আরও ১২টা এডুকেশন কাম রিক্রিয়েশন সেন্টার চালাচ্ছে ‘আমরা পদাতিক’।

শুধু মাথার উপর ছাদ কিংবা দু’বেলা খাবার নয়, একটা শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস, খেলাধুলোর সুযোগ এবং নিজের প্রতিভা বিকশিত করার পরিসর। সেই জায়গাটাই তৈরি করতে চাইছে ‘আমরা পদাতিক’। সংস্থার উদ্যোগে চালু হওয়া ডে কেয়ার সেন্টারে এখন রয়েছে ৯৫ জন শিশু। যেসব শিশু স্কুলে যায় না, বাড়িতেও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া কিংবা পড়াশোনার সুযোগ পায় না, তাদের কাছে পৌঁছনোই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি, স্কুলে ভর্তি থাকলেও নিয়মিত স্কুলে না যাওয়া শিশুদেরও যত্ন নেওয়া হয় এখানে। সপ্তাহে ছ’দিন স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিশুর জীবনেই শিক্ষার সেই নিয়মিত ছন্দ অনুপস্থিত। তাদের আবার স্কুলমুখী করে তোলার পাশাপাশি ডে কেয়ার সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে।

একটি শিশুর আগ্রহ কোন দিকে, সে কী শিখতে চায়, কোন কাজে তার আনন্দ, সেই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় ডে কেয়ার সেন্টারে। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি আঁকা, নাচ, গান, আবৃত্তি এবং ক্যারাটের মতো নানা বিষয়ে শিশুদের উৎসাহ দেওয়া হয়। ডকুমেন্টেশন অফিসার রমা সরকার জানান, শিশুদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে শেখানো হয়। কেউ আঁকা শিখতে চাইলে তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়। কেউ আঁকার পাশাপাশি আবৃত্তি কিংবা নাচ শিখতে চাইলে, তার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের শেখার অগ্রগতি ও তাদের কাজের নথিও সংরক্ষণ করা হয়।

সেন্টার কো-অর্ডিনেটর পিয়ালি আইচের কথায়, অনেক শিশুর মধ্যেই স্কুলে যাওয়ার আগ্রহের অভাব রয়েছে। কিন্তু ডে কেয়ার সেন্টারে আসতে তারা পছন্দ করে। আঁকা, ক্যারাটে, নাচ ও গানের প্রতি তাদের আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে। এই আগ্রহকেই কাজে লাগিয়ে শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে। কারণ, শিক্ষার প্রতি টান তৈরি করতে পারলে স্কুলে যাওয়ার অভ্যাসও ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে পারে।

এই উদ্যোগের সাফল্যের নজিরও রয়েছে। সেখানকার অনেক শিশুই পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করেছে। কেউ কেউ স্নাতকোত্তর স্তরেও ভালো ফল করেছে। দিল্লির একটি সংস্থার তরফে ৭১ জন শিশুকে বৃত্তিও দেওয়া হয়েছে। তিন থেকে ১৮ বছর বয়সি ছেলেমেয়েরা এই বৃত্তি পেয়েছে। ফলে আর্থিক ও সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও যে শিক্ষার পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই আশাই জোরালো হচ্ছে।

শিশুদের ডে কেয়ার সেন্টারে নিয়ে আসা কিংবা নিয়মিত স্কুলে পাঠানোই একমাত্র কাজ নয় ‘আমরা পদাতিক’-এর। যৌনকর্মী মায়েদের কাউন্সেলিং করা এবং সন্তানদের এই কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য তাঁদের উৎসাহিত করাও উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাঁদের বোঝানো, সন্তানদের পড়াশোনা ও বিকাশের সুযোগ সম্পর্কে সচেতন করা এবং শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়।

 

১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীদের নিয়েও কাজ করছেন সংস্থার ইউথ ফেসিলিটেটর লতা রায়। অন্যদিকে, অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন অভীক সাঁতরা। সেক্রেটারি শতাব্দি সাহা প্রেসিডেন্ট পুজা রায় এবং রতন দোলুই যারা যৌনকর্মী সন্তান, তারা এই সংগঠনটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে মূল উদ্যোগ নিয়েছে এবং তাদের সহযোগিতা করছে এডভোকেসি অফিসার মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার মৌসুমী চৌধুরী দাম।

ডে কেয়ার সেন্টারের পরবর্তী পরিকল্পনা আরও বড়। যৌনকর্মীদের সন্তানদের জন্য ভবিষ্যতে নাইট কেয়ার সেন্টার তৈরির ভাবনাও রয়েছে সংস্থার। উদ্দেশ্য, যেসব শিশুর রাতে নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে থাকার প্রয়োজন, তাদের সেই সুযোগ করে দেওয়া। তবে তার জন্য প্রয়োজন ছ’টি ঘর, একটি রান্নাঘর এবং শৌচাগার। এই পরিকল্পনা এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা গেলে রাতেও শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে বলে আশা সংস্থার।

সমাজের চোখে পরিচয়ের কারণে কোনও শিশুর শৈশব যেন ছোট হয়ে না যায়, কোনও শিশুর স্বপ্ন যেন জন্মের আগেই থমকে না দাঁড়ায়, এই ভাবনা থেকেই ‘আমরা পদাতিক’-এর উদ্যোগ। যে শিশুরা প্রতিনিয়ত অবহেলা আর বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তাদের জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তার একটা পরিসর তৈরি করাই এই প্রচেষ্টার মূল কথা। কারণ, কোনও শিশুর পরিচয় তার মায়ের পেশা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। তারও অধিকার রয়েছে সম্মান নিয়ে বাঁচার, নিজের পছন্দের বিষয় শেখার, স্কুলে যাওয়ার এবং নিজের মতো করে ভবিষ্যৎ গড়ার। সেই অধিকারটুকু বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়েই ৯৫টি শিশুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে ‘আমরা পদাতিক’।