• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 25 October, 2026

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া যুক্তিসংগত নয়

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক নিয়ম, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিয়ম ভাঙলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে তাদের পরিষেবার নকশাতেই নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, স্কুলে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো এবং অভিভাবকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া যুক্তিসংগত নয়

Photo: Magnific

ইন্টারনেট আজকের দিনে শিক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও মতপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে এটি নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছে। তাই শিশুদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার কেড়ে নেওয়া কখনও যুক্তিসংগত হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক অবস্থানের মূল কথা হল, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু সেই সুরক্ষার নামে তাদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা চলবে না।

সংবিধানের ২১ এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুরা পড়াশোনা করে, নতুন তথ্য জানে, নিজেদের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে এবং পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ফলে ইন্টারনেট থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং বয়সের ভিত্তিতে নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে অনেক শিশু শিক্ষা ও তথ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

কিন্তু ইন্টারনেটের এই উপকারিতার পাশাপাশি বিপদের দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতন, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেল, অশালীন বিষয়বস্তুর সংস্পর্শ এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় শিশুদের অনলাইন যৌন শোষণ ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার যেমন জরুরি, তেমনই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশগুলি তাৎপর্যপূর্ণ। শিশুদের যৌন নির্যাতন-সংক্রান্ত বেআইনি বিষয়বস্তু শনাক্ত করা, অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তা সরিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট অভিযোগ আধিকারিক নিয়োগ এবং অভিযোগের নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা আনার মতো পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে অভিভাবকদের নজরদারি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অপরিচিত ব্যক্তির যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং বয়স অনুযায়ী ডিজিটাল শিক্ষা দেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিরাপদ ব্যবহারের পরিবেশ গড়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য।

অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের মতো কয়েকটি দেশ অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধের পথে হাঁটছে। কিন্তু কেবল বয়সের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই যে শিশুদের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করা যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। শিশুরা বিকল্প উপায়ে এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়াও বিপজ্জনক। তাই বাস্তবসম্মত, আনুপাতিক এবং কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থাই হওয়া উচিত ভারতের পথ।

এখানে সরকারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যম সংস্থাগুলির স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের উপর নির্ভর করলে চলবে না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক নিয়ম, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিয়ম ভাঙলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে তাদের পরিষেবার নকশাতেই নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, স্কুলে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো এবং অভিভাবকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়াও জরুরি।

তবে এই বিতর্কের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সংবিধানে অধিকার স্বীকৃত হলেই সেই অধিকার বাস্তবে সুরক্ষিত হয় না। নাগরিকের ভোটাধিকার-সহ বিভিন্ন অধিকার নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন শিশুদের ইন্টারনেটের অধিকার রক্ষার আলোচনাও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

রাষ্ট্রের প্রথম কর্তব্য নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা, অকারণে তা সংকুচিত করা নয়। শিশুদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার মধ্যে বিরোধ তৈরি না করে দুটিকে পরস্পরের পরিপূরক করে তুলতে হবে। নিরাপদ ইন্টারনেটই হোক লক্ষ্য, ইন্টারনেট থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করা নয়।