বাংলায় রাজনীতিতে পদ্ম ফোটার পর এবার চাষের মাঠেও সুদিন ফিরেছে পদ্মচাষিদের। রাজ্যের বিভিন্ন পদ্মচাষের এলাকায় এ বছর ফুলের ব্যাপক ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর পাইকারি বাজারে দ্বিগুণ দাম মেলায় স্বস্তিতে পদ্মচাষিরা।
গত বছর বন্যার জেরে রাজ্যের একাধিক পদ্মচাষের এলাকা যেমন—বীরভূম, বাঁকুড়া, পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া ও হুগলিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। এর জেরে স্থানীয় বাজারে পদ্মের জোগান কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যের বাইরে থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ পদ্মফুল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছিলেন পাইকারি ফুল ব্যবসায়ীরা। এ বছর বর্ষা দীর্ঘস্থায়ী হলে পদ্মফুলের উৎপাদন অনেকটাই ভালো হয়েছে। ফলে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ফুলের দাম বেশি মেলায় স্বস্তিতে চাষিরা।

বর্তমানে পদ্মফুল পিছু চাষিরা ৫ থেকে ৬ টাকা করে পাচ্ছেন। গত মরসুমে সেই দাম ছিল মাত্র আড়াই থেকে ৩টাকা। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাজারে চাহিদা বাড়ায় লাভের মুখ দেখছেন পদ্মচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
বীরভূমের আহমেদপুর রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ম উৎপাদন কেন্দ্র। সেখানে চার হাজারেরও বেশি চাষি ও ব্যবসায়ী দিনরাত এক করে ফুল সংগ্রহ, প্যাকেটবন্দি এবং বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। কলকাতা, শিলিগুড়ি ও মালদহের পাশাপাশি দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরেও পাঠানো হচ্ছে পদ্মফুল।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ৩০৯ বছরের বনেদিয়ানা, পুজোর রাশ ‘নারীশক্তি’র হাতে
চাষিদের একাংশের দাবি, দুর্গাপুজো-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের আয়োজনের অনুমতি বাড়ায় পদ্মের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আহমেদপুরের পদ্মচাষি রূপেন সরকার জানান, দুর্গাপুজোর সময় পদ্মের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এর পর জগদ্ধাত্রী পুজোতেও ভালো বিক্রি হয়। পাশাপাশি দীপাবলির জন্য দিল্লি থেকে আগাম অর্ডার আসতে শুরু করে।

রূপেন সরকারের দাবি, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে অনুমতিপ্রাপ্ত দুর্গাপুজোর সংখ্যা বেড়েছে। তাঁর বক্তব্য, লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত লাভপুর থানার এলাকায় এ বছর নতুন করে ৬০টি দুর্গাপুজো করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন ফুল উৎপাদনকারী এলাকার চাষি ও ব্যবসায়ীরা এ বছরের ফলন এবং উৎসবের মরসুমে বাড়তি চাহিদা নিয়ে আশাবাদী। তবে এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে উন্নত পরিকাঠামো এবং সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁরা তুলে ধরেছেন।
আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনিতে জোড়বাড়ির পুজোয় নবপত্রিকার আগমন
স্থায়ী বাজার, ফসর বিমা ও হিমঘরের দাবি
আহমেদপুরের বিশিষ্ট পদ্ম ব্যবসায়ী খোকন দাস গোলাপি ও সাদা দুই ধরনের পদ্মফুলই সরবরাহ করেন কলকাতার মল্লিকঘাট ফুলবাজারে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই ফুলবাজারে এ বছর দুই ধরনের পদ্মেরই ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
খোকন দাসের কথায়, দুর্গাপুজোয় গাঁদা ও অপরাজিতার পাশাপাশি পদ্মও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফুল। তাই পদ্ম কেনাবেচার জন্য একটি স্থায়ী ও নির্দিষ্ট বাজার গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পদ্মচাষিদের জন্য ফসল বিমা, আর্থিক সহায়তা এবং বিশেষ ধরনের হিমঘরের ব্যবস্থাও চান ব্যবসায়ীরা। খোকন দাস জানান, বর্তমানে পদ্মফুল বড়জোর ১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। রাজ্যের বিভিন্ন পদ্ম উৎপাদনকারী জেলায় বিশেষ হিমঘর তৈরি করা গেলে ফুল দীর্ঘ সময় ভালো রাখা সম্ভব হবে। তাতে দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে পরবর্তী উৎসবগুলির মরসুমেও সরবরাহ বজায় রাখা সহজ হবে।
আহমেদপুরের পাশাপাশি পূর্ব বর্ধমানের কালনা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর, বাঁকুড়ার বড়জোড়া এবং মানার চর-সহ একাধিক এলাকায় পদ্মচাষ ঘিরে আশার আলো দেখছেন কৃষকরা। উৎসবের মরসুমে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সমস্ত এলাকার চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।
সন্ধিপুজোয় ১০৮ পদ্মের মাহাত্ম্য
পদ্মফুল ছাড়া দুর্গাপুজো (Durga Puja) সম্ভব নয়। বিশেষ করে সন্ধিপুজোয় ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন করতে হয়। দেবী দুর্গার চণ্ডী বা চামুণ্ডা রূপের আরাধনায় ভক্তরা ১০৮টি পদ্ম নিবেদন করেন এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালান।
পদ্মের এই বিশেষ গুরুত্বই দুর্গাপুজোর (Durga Puja) মরসুমে ফুলটির চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ বছর ভালো ফলন ও বাজারে বেশি দাম পাওয়ায় বাংলার পদ্মচাষিরা যেমন স্বস্তিতে, তেমনই সরকারি সহায়তা মিললে এই চাষকে আরও লাভজনক করে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন পদ্মফুলের ব্যবসায়ীরা।
দেখুন: সপ্তমীর সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসব, কলকাতায় শমীক ভট্টাচার্য




