• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 14 October, 2026

শরৎ এল রে: ৩০৭ বছরের প্রাচীন রায় পরিবারের দুর্গাপুজো, দেবী এখানে চামুণ্ডা রূপে পূজিতা, স্বপ্নাদেশে বন্ধ বলিপ্রথা

লোককথা অনুযায়ী, ওই রাতেই দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, ‘কীরে, আমার বাহনকে মেরে ফেললি? তোরা এ বার থেকে বলি বন্ধ কর।‘ সেই নির্দেশের পর থেকেই রায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় বলির প্রথা বন্ধ হয়ে যায়

শরৎ এল রে: ৩০৭ বছরের প্রাচীন রায় পরিবারের দুর্গাপুজো, দেবী এখানে চামুণ্ডা রূপে পূজিতা, স্বপ্নাদেশে বন্ধ বলিপ্রথা

Image: AI নির্মিত

বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে জমিদারি প্রথা। আর্থিক সংকটে বহু দুর্গাপুজো তাই বন্ধ হয়ে যায়। তবে গ্রামবাংলার বেশ কিছু বনেদি বাড়িতে আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে দুর্গাপুজো। জাঁকজমক আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে তবে ইতিহাস ও প্রথার টানে সেই পুজোগুলির গুরত্ব আজও অমলিন। তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী পুজো হল হাওড়া আমতা-২ ব্লকের আমরাগড়ী গ্রামের রায় পরিবারের দুর্গোৎসব। এবছর ৩০৭ বছরে পা দিয়ে এই পুজো। একচালা প্রতিমা, দেবীর চামুণ্ডা রূপ এবং স্বপ্নাদেশের পর বলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কাহিনি এই পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।

স্বপ্নাদেশে প্রতিষ্ঠিত গজলক্ষ্মী মাতা এস্টেটের

রায় পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিমাস জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে গজলক্ষ্মী মাতা এস্টেটের প্রতিষ্ঠার কথা। এস্টেটের বর্তমান সম্পাদক তথা রায় পরিবারের সদস্য সৌরভ রায় জানান, বাংলার ১১২৬ বঙ্গাব্দের ১৫ বৈশাখ এই এস্টেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বর্ধমানের মহারাজের অধীনস্থ জমিদার প্রয়াত শান্তি রায়।

কথিত আছে, একসময় বাণিজ্যের উদ্দেশে বেরিয়ে শান্তি রায় অমরাগড়ী গ্রামে একটি নৌকা নোঙর করেন। সেথানে রাত কাটানোর সময় স্বপ্নে দেবী গজলক্ষ্ণী তাঁকে নির্দেশ দেন, ‘তুই আমায় ছেড়ে কোথাও চলে যাস না। তুই এখানেই আমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা কর।‘

দেবীর সেই স্বপ্নাদেশের পরই অমরাগড়ী গ্রামে বসবাস শুরু করেন শান্তি রায়। গ্রামবাসীদের নিয়ে গড়ে তোলেন গজলক্ষ্মী মাতা এস্টেট। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে বাইরে থেকে এনে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে গ্রামটিকে আদর্শ গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও নেন তিনি। সেই থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এস্টেটের পুজো ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলে আসছে।

এস্টেটের বর্তমান সভাপতি অসিতকুমার রায়, সম্পাদক সৌরভ রায়, কোষাধ্যক্ষ দিব্যেন্দু রায়-সহ মোট ১৪ জন সদস্য দুর্গাপুজো ও অন্যান্য উৎসব পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: সপ্তমীতে খুলে যাচ্ছে পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ভবনের দ্বার, বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগ খেতে পারবেন সাধারণ মানুষও

প্রতিপদ থেকেই শুরু দুর্গোৎসব

অমরাগড়ী রায় পরিবারের দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য একচালা প্রতিমা এবং দেবীর চামুণ্ডা মূর্তি। মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। চণ্ডীপাঠ ও প্রতিদিনের সন্ধ্যারতির মধ্যে দিয়ে প্রথম দিন থেকেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়।

একসময় এই পুজোকে ঘিরে ব্যাপক জাঁকজমক হতো। সারারাত ধরে যাত্রাপালা চলত। কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে পুজোর সূচনা করা হতো এবং মহিষ বলির প্রথাও ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই আড়ম্বর অনেকটাই কমেছে। এখন কামানের তোপধ্বনির পরিবর্তে গাছবোমা ফাটিয়ে পুজোর সূচনা করা হয়।

স্বপ্নাদেশেই বন্ধ মহিষ বলি

এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ১৮৪ বছরের পুরনো একটি কাহিনি। কথিত আছে, সেই সময় অমরাগড়ী এলাকা ছিল জল-জঙ্গল ও বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোয় মহিষ বলি দেওয়ার জন্য এক রাতে বলির কাতান হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন এক কামার। পথে একটি বাঘ তাঁকে ঘিরে ধরে। প্রাণ বাঁচাতে কামার একটি গাছে উঠে পড়েন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার বাঘটি গাছের নিচে বসে থাকে।

এদিকে সন্ধিপুজোর বলির সময় এগিয়ে আসছিল। পুজোমণ্ডপে ঘণ্টা বাজার পরেও বাঘটি গাছের নিচে বসে থাকায় বিপাকে পড়েন কামার। শেষ পর্যন্ত দেবীর নাম স্মরণ করে গাছ থেকে ঝাঁপ দেন তিনি। ঘটনাচক্রে বাঘের ঘাড়ের উপর পড়ে তাঁর হাতে থাকা কাতানের আঘাতে বাঘটির মৃত্যু হয়। সেখানেই বলির কাজ সম্পন্ন হয় বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

লোককথা অনুযায়ী, ওই রাতেই দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, ‘কীরে, আমার বাহনকে মেরে ফেললি? তোরা এ বার থেকে বলি বন্ধ কর।‘ সেই নির্দেশের পর থেকেই রায় পরিবারের দুর্গাপুজোয় বলির প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ‘রজনী কুটির’-এর দুর্গাপুজো, বর্গি হামলার ইতিহাসের দলিল

নাড়ু, নবপত্রিকা ও সন্ধিপুজোর বিশেষ আয়োজন

পুজোর প্রতিটি দিনেই রয়েছে কিছু নিজস্ব রীতি। পঞ্চমীর দিন রায় পরিবারের মেয়ে ও গৃহবধূরা প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজারটি নারকেল নাড়ু তৈরি করে দেবীকে নিবেদন করেন। সপ্তমীর দিন নবপত্রিকাকে পালকির মতো দুলিয়ে পুজোমণ্ডপে নিয়ে আসা হয়।

অষ্টমীর দিন নির্দিষ্ট সময়ে সন্ধিপুজোর পাশাপাশি হোম, ধুনো পোড়ানো ও আরতির আয়োজন করা হয়। জ্বালানো হয় ১০৮টি প্রদীপ। নবমীর সন্ধ্যায় পুজোমণ্ডপে উপস্থিত সকলের মধ্যে লুচি ও দানাদার ভোগ বিতরণ করা হয়।

দশমীর বিসর্জনেও রয়েছে বিশেষ নিয়ম। রীতি অনুযায়ী, দুপুর ১২টার পর এবং সূর্যাস্তের আগেই প্রতিমা বিসর্জন করতে হয়। প্রায় ১৫২ বছর আগে দশমীর দিন দুপুর ১২টার সময় রায় পরিবারের এক সদস্যের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই ঘটনার পর থেকেই এই নিয়ম চালু হয়েছে। মন্দিরের পাশের পুকুরেই বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা।

সম্প্রীতির মিলক্ষেত্র

অমরাগড়ী গ্রামের রায় পরিবারের দুর্গাপুজো আজ আর শুধু একটি পরিবারের উৎসব নয়। গ্রামের সব সম্প্রদায়ের মানুষেরি অংশগ্রহণে এই পুজো পরিণত হয়েছে মিলনক্ষেত্রে। পুজোর আগে গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজমিস্ত্রিরা মন্দিরের ভিতরে ও বাইরে সংস্কার এবং রং করার কাজে সহযোগিতা করেন। এস্টেটের অন্য মন্দিরগুলির সংস্কার ও রং করার কাজেও তাঁরা অংশ নেন। প্রতিমা বিসর্জনের সময়ও প্রতিমা কাঁধে বহনে সহযোগিতা করেন তাঁরা। অমরাগড়ী গ্রামে এটিই একমাত্র দুর্গাপুজো। পুজোর দিনগুলিতে এই মণ্ডপ হয়ে ওঠে গ্রামের মানুষের মিলস্থল।

দেখুন: