দুর্বল এশীয় বাজারের প্রভাব, ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লাগাতার বিক্রির জেরে সোমবার বড়সড় পতনের মুখে পড়ল ভারতীয় শেয়ার বাজার। দিনের লেনদেনে ৭০০ পয়েন্টেরও বেশি পড়ে গেল সেনসেক্স। অন্যদিকে, নিফটি ৫০-ও প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি পতনের মুখে পড়ে। তবে বড় সংস্থার শেয়ারে পতন দেখা গেলেও তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী ছিল মাঝারি ও ছোট সংস্থার শেয়ার।
সোমবার লেনদেনের এক পর্যায়ে সেনসেক্স ৭১,৭৪২.৫১ পয়েন্টে নেমে যায়। অন্যদিকে, নিফটি ৫০ দিনের সর্বনিম্ন স্তর ২২,৩৩১ পয়েন্টে পৌঁছয়, যা আগের স্তরের তুলনায় ০.৮৫ শতাংশ কম। তবে এই পরিস্থিতিতেও নিফটি মিডক্যাপ ১৫০ সূচক ০.৬০ শতাংশ এবং নিফটি স্মলক্যাপ ২৫০ সূচক ১.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
কেন পড়ল সেনসেক্স ও নিফটি?
ব্যাঙ্ক ও তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শেয়ারে বিক্রির চাপ
সেনসেক্স ও নিফটি ৫০-এ ব্যাঙ্কিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের সংস্থাগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই দুই ক্ষেত্রের শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় প্রধান সূচকগুলিও নেমে যায়। দিনের লেনদেনে নিফটি ব্যাঙ্ক সূচক ১ শতাংশ এবং নিফটি আইটি সূচক ১.২ শতাংশ কমে যায়।
শুধু ব্যাঙ্কিং ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের দুর্বলতা এবং অপরিশোধিত তেলের চড়া দামের কারণে একাধিক বড় সংস্থার শেয়ারেও মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। দুপুর ২টো নাগাদ সেনসেক্সের ৩০টি সংস্থার মধ্যে ২৩টির শেয়ারই নিম্নমুখী ছিল। ভারতী এয়ারটেল, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, রিলায়েন্স, তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা, লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার শেয়ার সূচকের পতনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।
১৮ মাসের সর্বোচ্চ স্তরের কাছে ডলার
বাজারে পতনের অন্যতম কারণ ডলারের শক্তিশালী অবস্থান। সোমবার ডলার সূচক ১০২.৫-এর কাছাকাছি পৌঁছয়, যা গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির জেরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডলারের শক্তিবৃদ্ধি ভারত-সহ উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার উপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একাংশ আমেরিকার সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝোঁকেন। এর ফলে ভারতীয় বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। চলতি অক্টোবর মাসে এখনও পর্যন্ত ডলার সূচক প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে এই সূচক প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিপুল বিক্রি
ভারতীয় শেয়ার বাজারে পতনের আরেকটি বড় কারণ বিদেশি লগ্নিকারীদের লাগাতার শেয়ার বিক্রি। ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে শুক্রবার পর্যন্ত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৪৪,১৬৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত তাঁদের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ ৪ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।
জিওজিত ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ ভি কে বিজয়কুমারের মতে, চলতি বছরে ভারতীয় বাজারের দুর্বল পারফরম্যান্সের অন্যতম প্রধান কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ প্রত্যাহার। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডে ঝুঁকিহীন আয়ের হার ৫.২ শতাংশের উপরে থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারত থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়।
বিজয়কুমারের মতে, শেয়ারগুলির মূল্যায়ন আকর্ষণীয় হয়ে উঠলে এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য লাভের তুলনায় ঝুঁকি কমলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। তবে অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম এবং আমেরিকার সরকারি বন্ডের উচ্চ ফলন আপাতত ভারতীয় বাজারের সামনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে শেয়ার বাজারের উপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।




