• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 7 October, 2026

রক্তের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসার টানে কিডনি দান! সন্দেহের বেড়া ভেঙে মানবিকতার পক্ষে কলকাতা হাইকোর্ট

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, অঙ্গদানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লেনদেন, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তদন্তের পরেও যদি আর্থিক লেনদেন বা দালালের কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ না মেলে, তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে একজন প্রকৃত দাতার মানবিক ইচ্ছাকে আটকে রাখা যায় না।

রক্তের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসার টানে কিডনি দান! সন্দেহের বেড়া ভেঙে মানবিকতার পক্ষে কলকাতা হাইকোর্ট

Image: AI নির্মিত

রক্তের সম্পর্ক নেই। নেই পারিবারিক আত্মীয়তার বন্ধনও। তবু একজন মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দিতে চেয়েছিলেন এক মহিলা। কারণ, তাঁর কথায়, অসুস্থ মানুষটিকে তিনি ভালোবাসেন, তাঁর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। স্বামী গাড়ি চালাতেন ওই ব্যক্তির। সেই সূত্রে পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল মানবিক সম্পর্ক। কিন্তু সেই সম্পর্ক নিয়েই উঠেছিল প্রশ্ন। অঙ্গদানের পিছনে কোনও আর্থিক লেনদেন রয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহে আটকে যায় কিডনি প্রতিস্থাপনের অনুমতি। শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অসুস্থ ব্যক্তি। আর সেখানেই মিলল মানবিকতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

মামলাকারী রঞ্জিত কুমার ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছিলেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। কলকাতার মুকুন্দপুরের নারায়ণা হেলথে চিকিৎসাধীন রঞ্জিতবাবুর পরিবারের মধ্যে উপযুক্ত কিডনি দাতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেই সময়ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাঁর পরিচিত এক মহিলা।

ওই মহিলা ছিলেন রঞ্জিতবাবুর গাড়িচালকের স্ত্রী। তাঁর রক্তের গ্রুপও ছিল উপযুক্ত। স্বেচ্ছায় নিজের একটি কিডনি দান করে রঞ্জিতবাবুর জীবন বাঁচাতে চেয়েছিলেন তিনি। হাসপাতালের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়।
কিন্তু অনুমোদনের আগে শুরু হয় দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত যাচাই। পুলিশি তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে কোনও নগদ অর্থ বা অন্য কোনও আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ নেই। কোনও দালাল, মধ্যস্থতাকারী বা অঙ্গ বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির সন্ধানও মেলেনি।

তারপরও অঙ্গদানের অনুমতি মেলেনি। জেলা স্তরের যাচাই কমিটির পর রাজ্য স্তরের অনুমোদন কমিটিও আবেদন খারিজ করে। মূলত দাতার স্বামীর ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং তিনি কবে থেকে রঞ্জিতবাবুর গাড়ি চালাচ্ছেন, সেই সংক্রান্ত নথিতে অসঙ্গতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দাতার স্বামী দাবি করেছিলেন, তিনি ২০২১-২২ সাল থেকেই ওই কেন্দ্রে গাড়ি চালাচ্ছেন। অথচ তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু হয় ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ২০২১ সাল থেকেই তিনি চালক হিসেবে কাজ করতেন, এমন নির্দিষ্ট নথিও জমা পড়েনি। এই অসঙ্গতির ভিত্তিতেই দাতা ও রঞ্জিতবাবুর পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

তবে হাইকোর্টে ঘটনার মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে ওই মহিলা জানান, প্রায় তিন-চার বছর ধরে তিনি রঞ্জিতবাবুকে চেনেন। তাঁর স্বামী গাড়ি চালানোর সুবাদে রঞ্জিতবাবু এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হয়েছিল। অসুস্থ মানুষের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে নিজের ইচ্ছাতেই কিডনি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

আদালতে ওই মহিলা জানান, তিনি রঞ্জিতবাবুকে ‘খুব ভালোবাসেন’ এবং তাঁর কষ্ট দেখে তাঁকে সাহায্য করতে চান। এই বক্তব্যের পাশাপাশি আইনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালের ট্রান্সপ্ল্যানটেশন অফ হিউম্যান অর্গান্স অ্যান্ড টিসুস অ্যাক্ট (Transplantation of Human Organs and Tissues Act)-এর ৯(৩) ধারা অনুযায়ী, নিকট আত্মীয় না হলেও বিশেষ কারণ, স্নেহ বা ভালোবাসার ভিত্তিতে অঙ্গদানের সুযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে অনুমোদন কমিটির পূর্বানুমোদন প্রয়োজন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, অঙ্গদানের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লেনদেন, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তদন্তের পরেও যদি আর্থিক লেনদেন বা দালালের কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ না মেলে, তাহলে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে একজন প্রকৃত দাতার মানবিক ইচ্ছাকে আটকে রাখা যায় না।

বিচারপতি কৃষ্ণ রাও স্পষ্ট করে দেন, আর্থিক লেনদেনের নির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলে আবেদনকারীদের উপর অতিরিক্ত প্রমাণের বোঝা চাপিয়ে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুমতি আটকে রাখা উচিত নয়। কোনও ব্যক্তি যদি ভালোবাসা, স্নেহ বা মানবিকতার কারণে অঙ্গদান করতে চান, তাঁকে অবিশ্বাস করার মতো বিশ্বাসযোগ্য কারণ না থাকলে শুধুমাত্র সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়।

এরপর রাজ্য স্তরের অনুমোদন কমিটির সিদ্ধান্ত খারিজ করে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিটিকে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। এই রায় যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল, মানবিক সম্পর্কের মূল্য সবসময় রক্তের সম্পর্কের মাপকাঠিতে মাপা যায় না। অঙ্গদানের নামে বাণিজ্যিক কারবার বন্ধ করা যেমন আইনের দায়িত্ব, তেমনই প্রকৃত ভালোবাসা, স্নেহ ও নিঃস্বার্থ সাহায্যের হাতকে শুধুমাত্র সন্দেহের কারণে থামিয়ে দেওয়াও কাম্য নয়। একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসা আর এক মানুষের এই ইচ্ছাকেই শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব দিল কলকাতা হাইকোর্ট।