রাজ্য স্তরে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের লোকভবন। রাজ্যের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের জন্য এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। তবে প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসতেই তা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। ১৯৪৬ সালের কলকাতা গণহত্যা এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’—এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ঘিরেই পড়ুয়াদের প্রবন্ধ লেখার জন্য বিষয় নির্ধারণ করেছে লোকভবন।
সম্প্রতি কলকাতায় রাস্তার নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে এবং ১৯৪৬ সালের কলকাতা গণহত্যার প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছিল। সেই আবহেই লোকভবনের প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় ওই ইতিহাসকে বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিষয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে চাপানউতোর।
লোকভবনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রতিযোগিতাটি দু’টি বিভাগে হবে। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির স্কুলপড়ুয়াদের জন্য একটি বিভাগ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের জন্য অন্য বিভাগ। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই প্রবন্ধ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকছে।
স্কুল বিভাগের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ‘১৯৪৬ সালের কলকাতা গণহত্যাযজ্ঞ—কারণ ও ফলাফলসমূহ’ বিষয়টি। এই বিভাগের প্রতিযোগীদের তিন থেকে চার হাজার শব্দের মধ্যে প্রবন্ধ লিখতে হবে। অন্যদিকে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের জন্য বিষয়টি আরও দীর্ঘ এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে সামনে রেখেই তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের জন্য নির্ধারিত বিষয়—‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস—ভারতের চিরায়ত সভ্যতার ভিত্তির ওপর এক মারাত্মক আক্রমণ’। এই বিভাগে পাঁচ থেকে ছয় হাজার শব্দের প্রবন্ধ জমা দিতে হবে।
বিষয় নির্বাচনের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই সরব রাজনৈতিক মহল। তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন মমতাপন্থী তৃণমূল নেতা তথা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যপালের সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে এই ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য প্রচারের বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কুণাল বলেন, “এটা খুবই আপত্তিকর। রাজ্যপালের কাজ বিজেপি ভাষ্য প্রচার করা নয়। ওঁর উচিত সংবিধানকে রক্ষা করা।”
একই সুরে সমালোচনা করেছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীও। তাঁর দাবি, রাজ্যপালের মূল দায়িত্ব হল সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা চলছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা। রাজ্যপাল যদি বিজেপির রাজনৈতিক ভাষ্য প্রচারের ভূমিকা নেন, তাহলে সাংবিধানিক পদটির গুরুত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুজনের কথায়, “রাজভবনের মূল দায়িত্ব হল রাজ্যে সংবিধান সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা। রাজ্যপাল সংবিধানের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এটাই প্রত্যাশিত।” তাঁর আরও অভিযোগ, রাজ্যপাল যদি বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রচারের চেষ্টা করেন, তাহলে রাজভবনের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। এমনকি রাজ্যপালকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি করে দেওয়ার কটাক্ষও করেন তিনি।
এদিকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছে লোকভবন। প্রতিটি বিভাগে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের জন্য পৃথকভাবে পুরস্কার দেওয়া হবে। স্কুল বিভাগে প্রথম পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় ৩৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ২৫ হাজার টাকা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগে প্রথম পুরস্কার এক লক্ষ টাকা, দ্বিতীয় ৭৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা।
শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারাই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন। প্রতিযোগীদের হাতে লেখা অথবা টাইপ করা প্রবন্ধের মুদ্রিত কপি কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। লোকভবনে গিয়ে সরাসরি প্রবন্ধ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। আবেদনের শেষ তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০২৬।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, প্রবন্ধ তৈরির ক্ষেত্রে কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর বা এআই-উৎপাদিত বিষয়বস্তু ব্যবহার করা যাবে না। এ বিষয়ে প্রতিযোগীদের ঘোষণাপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। আগামী বছর ২৭ জানুয়ারি লোকভবনে আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।




