ঢাকার উত্তরা থেকে ধরা পড়া এক ভারতীয় নাগরিককে ঘিরে এখন তোলপাড়। ধৃতের নাম, নাম রবিউল ইসলাম (Rabiul Islam), বয়স ৪৪। বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, তিনি গুপ্তচরবৃত্তি (Espionage) করছিলেন। রবিউল অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কে এই রবিউল ইসলাম
ধৃত রবিউল পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, বয়স ৪৪। পুলিশের রিমান্ড আবেদন অনুযায়ী তিনি উত্তর ২৪ পরগনার মতিয়া থানা এলাকার গৌরীভোজ গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। আদালতে তিনি জানিয়েছেন, পেশায় তিনি কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
কীভাবে গ্রেপ্তার
পুলিশের বক্তব্য, রবিউল ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর (Bhomra Land Port) দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন এবং ২২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (DB) জানায়, মঙ্গলবার ভোর ৩টে নাগাদ উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টর থেকে তাঁকে আটক করা হয়। শুরুতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় (Section 54) তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হাতে আটক ভারতীয় গুপ্তচর রবিউল ইসলাম রবির কাছে পাওয়া ভারতীয় আধার ও প্যান কার্ডে তার জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ০১.০১.১৯৮২; তবে তার সঙ্গে থাকা পাসপোর্টে জন্মতারিখ হিসেবে লেখা রয়েছে ০৯.০৪.১৯৮১। আবার, ২১ জুন ২০২৬ এ রবিউল ইসলাম যে পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ… pic.twitter.com/hmH28uYOQ9
— Sami (@ZulkarnainSaer) September 24, 2026
প্রথমে সন্দেহ, তারপর মামলা
প্রথম দিকে অভিযোগ ছিল কিছুটা ধোঁয়াশাভরা। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা র-এর (RAW) এজেন্ট কি না এবং দেশের নানা জায়গায় সাম্প্রতিক নাশকতার সঙ্গে জড়িত কি না, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। পুলিশের দাবি ছিল, তাঁর সন্দেহজনক গতিবিধি চোখে পড়েছে এবং বারবার বাংলাদেশে আসার সুনির্দিষ্ট কারণ তিনি জানাতে পারেননি।
এরপর ১ অক্টোবর ছবিটা বদলায়। উত্তরা পশ্চিম থানায় ডিবির এক পরিদর্শক তাঁর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে (Official Secrets Act) মামলা করেন। অভিযোগ, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং স্পর্শকাতর তথ্য পাচার। এফআইআরের বয়ান অনুযায়ী, তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি আর স্পর্শকাতর নথি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছেন।
গরমিল কোথায়
পুলিশের যুক্তির বড় অংশ জুড়ে রবিউলের কাগজপত্র। ভারতীয় পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স আর পরিচয়পত্র যাচাই করে নাকি জন্মতারিখে অমিল মিলেছে। তাঁর পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে লেখা সৌদি আরবের রিয়াধ (Riyadh)। তদন্তকারীদের দাবি, জেরায় রবিউল স্বীকার করেছেন যে গত ১০ থেকে ১২ বছরে তিনি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে গিয়েছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পর্যটক ভিসায় (Tourist Visa)। পুলিশের আরও অভিযোগ, ব্যবসার আড়ালে আদতে তিনি গুপ্তচরবৃত্তি করতেন।
রবিউল কী বলছেন
আদালতে যাওয়ার পথে সংবাদমাধ্যমকে রবিউল বলেছেন, কোনও কারণ ছাড়াই তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে, র-এর সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর আরও অভিযোগ, গ্রেপ্তারির পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে আসাটা ভুল হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রিমান্ডের হিসাব
প্রথমে ঢাকার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তা ফুরোলে রবিবার ফের চার দিনের রিমান্ডের নির্দেশ দেন ম্যাজিস্ট্রেট। মামলা দায়েরের পর অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। পুলিশ চেয়েছিল ১০ দিন। অর্থাৎ ধৃত এখনও পুলিশ হেফাজতে। কোনও অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট কী
ঔপনিবেশিক আমলের ১৯২৩ সালের এই আইনে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস বা পাচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সংস্থান আছে। আগেও এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২১ সালে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তারির সময় সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি সরব হয়েছিল।
এরপর কী
তদন্ত চলছে, আর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যে ঘটনাটির কূটনৈতিক প্রভাবও নজরে থাকবে। ভারতের বিদেশমন্ত্রক কী অবস্থান নেয়, রবিউল ভারতীয় দূতাবাসের সাহায্য (Consular Access) পান কি না, আর পুলিশ আদৌ কোনও শক্ত প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারে কি না, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরের দিকেই এখন তাকিয়ে সবাই।
দ্রষ্টব্য: এই নামেই তৃণমূল কংগ্রেসের একজন প্রাক্তন বিধায়কও আছেন। তিনি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি, এই প্রতিবেদনের সঙ্গে তাঁর কোনও সংশ্রব নেই।




