• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 1 October, 2026

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রায় ৪৭ বছর ধরে যে প্রকল্প কাগজে-কলমে ঘুরপাক খেয়েছে, এবার সেটিকে

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান

ফাইল চিত্র

ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রায় ৪৭ বছর ধরে যে প্রকল্প কাগজে-কলমে ঘুরপাক খেয়েছে, এবার সেটিকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে রাজ্য সরকার যে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বন্যায় জর্জরিত ঘাটাল ও সংলগ্ন এলাকার মানুষের কাছে এই উদ্যোগ শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে স্থায়ী মুক্তির সম্ভাবনা।
১৯৭৯ সালে ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়েছিল। এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বর্ষার জল দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে না। চারদিকে জল জমে দীর্ঘদিন জলবন্দি হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল নদী ও খালগুলিকে ব্যবহার করে জমে থাকা জল রূপনারায়ণে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রশাসনিক জটিলতা, কেন্দ্র-রাজ্যের মতপার্থক্য এবং অর্থের সংস্থানের সমস্যায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
এই দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে রাজ্য সরকারের বর্তমান উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু প্রকল্পের কথা বলা নয়, চলতি অর্থবর্ষেই ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত দেখিয়ে রাজ্য সরকার প্রকল্পটিকে বাস্তব কাজের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি স্পষ্ট করেছে। এর মধ্যে রাজ্যের ৭০০ কোটি টাকার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কেন্দ্রের কাছ থেকে ৫০০ কোটি টাকা পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। অর্থাৎ অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যায়নি; বরং নিজের অংশের অর্থ বরাদ্দ করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার বাস্তব
উদ্যোগ নিয়েছে।
এখানেই বর্তমান উদ্যোগের তাৎপর্য। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য হয়েছে, দাবি উঠেছে, বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল অর্থ এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছার সমন্বয়। বর্তমান রাজ্য সরকার সেই জায়গাতেই জোর দিয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে অর্থায়নের কাঠামো তৈরি করার পাশাপাশি রাজ্যের নিজস্ব অর্থ বরাদ্দ প্রকল্পটিকে গতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আরও ইতিবাচক বিষয় হল, প্রকল্পের কাজকে শুধুমাত্র দপ্তরকেন্দ্রিক না রেখে স্থানীয় স্তরেও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঘাটাল, চন্দ্রকোনা এবং দাসপুর এলাকার জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ক্ষেত্রেই সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই ধরনের স্থানীয় সমন্বয় বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে পারে।
রাজ্য সরকারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল নির্দিষ্ট সময়সীমা সামনে রাখা। পুজোর পরেই কাজ শুরু করে আগামী জুনের মধ্যে যতটা সম্ভব অগ্রগতি ঘটানোর লক্ষ্য এবং ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার প্রত্যাশা জানানো হয়েছে। একটি ৪৭ বছরের পুরনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকল্পের সাফল্য শুধু অনুমোদন বা বরাদ্দে নয়, সময়মতো কাজ শেষ করার মধ্যেই নিহিত।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের প্রভাবও বহুমাত্রিক। বন্যার জল দ্রুত বেরিয়ে গেলে শুধু মানুষের বাড়িঘর রক্ষা পাবে না, কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও উপকৃত হবে। প্রতি বছর বন্যার পরে ত্রাণ, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো মেরামতে যে বিপুল সরকারি অর্থ ও প্রশাসনিক শক্তি ব্যয় হয়, দীর্ঘমেয়াদে সেই চাপও কমতে পারে। ফলে এই প্রকল্পকে শুধুমাত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রকল্প হিসেবে দেখলে তার গুরুত্ব কম করে দেখা হবে।
অবশ্যই সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। খাল ও নদী সংস্কার, বাঁধের কাজ, জমি-সংক্রান্ত বিষয় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য— সব ক্ষেত্রেই সতর্ক পরিকল্পনা দরকার। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জগুলি থাকার অর্থ উদ্যোগ থেমে থাকা নয়। বরং এখন প্রয়োজন রাজ্য সরকারের ঘোষিত গতি বজায় রেখে প্রতিটি বাধা দ্রুত অতিক্রম করা।
ঘাটালের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে তখনই, যখন বর্ষার সময় জলবন্দি হওয়া অতীতের ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। সেই লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের অর্থ বরাদ্দ, কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রশাসনকে মাঠে নামানোর উদ্যোগ ইতিবাচক দিশা দেখাচ্ছে।
৪৭ বছর ধরে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান ছিল অপেক্ষার প্রতীক। এবার সেই অপেক্ষাকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকার নিয়েছে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ঘোষিত পরিকল্পনাকে দ্রুত বাস্তব কাজে পরিণত করা। অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সময়সীমাও সামনে রাখা হয়েছে— এখন ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দেওয়াই হবে রাজ্য সরকারের পরবর্তী বড় পরীক্ষা। ঘাটালের মানুষ সেই
পরিবর্তনের অপেক্ষায়।