নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি গণতন্ত্রে কমিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হল মানুষের বিশ্বাস— যে প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচন পরিচালনা করছে, সে নিজে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার কোনও পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত নয়। সেই বিশ্বাসে সামান্য চিড় ধরলেও তার প্রভাব নির্বাচনের ফলাফলের বাইরেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর পড়ে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। সংবাদ-প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই নির্বাচন কমিশনার গত দশ মাসে অন্তত ১৪ বার কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি নথিবদ্ধ করেছেন। কমিশন অবশ্য বলেছে, এগুলি ছিল স্বাভাবিক আলোচনার অংশ এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি পূর্ণ কমিশনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। ২০২৩ সালের যে আইনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলায় দুই বিচারপতির বেঞ্চে মতভেদ দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে উপযুক্ত সাংবিধানিক বেঞ্চ তা বিবেচনা করতে পারে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে নিয়োগের পদ্ধতি। আগের ব্যবস্থায় নির্বাচনী কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত কমিটিতে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ২০২৩ সালের আইনে তাঁর জায়গায় এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর মনোনীত মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁকে অস্বীকার করে স্বাধীন অবস্থান নিতে কতটা সক্ষম হবেন।
বিচারপতি দত্তের ক্রিকেটের ‘আম্পায়ার’-এর উদাহরণটি এই প্রশ্নটিকে সহজ করে বোঝায়। যে পক্ষ খেলায় অংশ নিচ্ছে, সেই পক্ষই যদি আম্পায়ার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি প্রভাবশালী হয়, তাহলে আম্পায়ার পরে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেও দর্শকদের একাংশের মনে সন্দেহ থেকে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও তাই শুধু নিরপেক্ষ থাকা যথেষ্ট নয়, নিরপেক্ষ বলে দৃশ্যমান হওয়াটাও জরুরি।
তবে এই বিতর্ক থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। একইভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগও প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। কমিশনের নিজের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি— দুই দিকই বিবেচনা করা দরকার।
কিন্তু এখানেই স্বচ্ছতার গুরুত্ব। নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য— এই দুই ঘটনা আলাদা হলেও মানুষের মনে তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। তাই কমিশনের দায়িত্ব এখন আরও বড়। ভোটার-তালিকায় নাম সংযোজন বা বাদ দেওয়ার নিয়ম, তথ্য ব্যবহারের পদ্ধতি, সফটওয়্যারের ভূমিকা এবং কমিশনের ভিতরে ভিন্নমত কীভাবে বিবেচিত হয়— এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা দরকার। সাম্প্রতিক বিতর্কের পর কমিশন যে কয়েকটি নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেগুলিও বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
অন্যদিকে, সংসদ ও সুপ্রিম কোর্টকে নিয়োগ-পদ্ধতির সাংবিধানিক প্রশ্নটি পরিষ্কারভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। কারণ নির্বাচন শুধু ভোটের দিন কয়েক ঘণ্টার ঘটনা নয়। ভোটার তালিকা তৈরি থেকে প্রার্থী মনোনয়ন, ভোটগ্রহণ এবং ফল ঘোষণা— পুরো প্রক্রিয়াটির প্রতি মানুষের আস্থা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন যেন সত্যিই একটি নিরপেক্ষ ‘আম্পায়ার’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য থাকে, তার জন্য শুধু আইনগত ক্ষমতা যথেষ্ট নয়। তার নিয়োগ, কাজের পদ্ধতি এবং জবাবদিহি— সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা থাকা দরকার। আজকের বিতর্কের আসল প্রশ্ন তাই কোনও ব্যক্তি বা দলের পক্ষে-বিপক্ষে নয়; প্রশ্ন হলো, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়।




