‘বন্দে মাতরম’ শুধু একটি গান নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি আবেগ ও ঐতিহ্যের নাম। সেই কারণেই গানটির মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু দেশপ্রেমের সঙ্গে ব্যক্তির বিবেক ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার সম্পর্ক কোথায়— সাম্প্রতিক এক শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সেই মৌলিক প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার অ্যাক্ট, ১৯৭১’-এর ৩ নম্বর ধারার আওতায় ‘বন্দে মাতরম’-কেও আনা হয়েছে। কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় গান গাওয়া বন্ধ করলে কিংবা গাইতে থাকা সমাবেশে বিঘ্ন ঘটালে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা দুটিই হতে পারে। সরকারি নির্দেশনায় ছয়টি স্তবক গাওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিল্পী ও লেখক টি এম কৃষ্ণের আবেদনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, কেউ যদি নিজের বিবেক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে ‘বন্দে মাতরম’-এর একটি বা সবকটি স্তবক না গাইতে চান, তাঁকে যেন ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে না হয়। আদালত ১৯৮৬ সালের ঐতিহাসিক ‘বিজো ইমানুয়েল’ মামলার নীতির কথাও স্মরণ করেছে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, আদালত ‘বন্দে মাতরম’-এর জাতীয় গানের মর্যাদা নিয়ে এখনই কোনও সিদ্ধান্ত দিতে যায়নি। কোন গান জাতীয় প্রতীক হবে, কিংবা তার কতগুলি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া হবে— এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রকে আদালত আলাদা রেখেছে। কিন্তু রাষ্ট্র কোনও জাতীয় প্রতীকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য নাগরিকের উপর ফৌজদারি শাস্তির ভয় চাপাতে পারে কি না, সেই সীমারেখাটিই আদালত পরীক্ষা করতে চাইছে।
এখানে ‘গাওয়া’ এবং ‘গাইতে বাধা দেওয়া’— এই দুটি আচরণের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও অনুষ্ঠানে অন্যদের গান গাওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়া এক ধরনের আচরণ, আর নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নীরব থাকা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে এই পার্থক্য অগ্রাহ্য করা যায় না।
১৯৮৬ সালের ‘বিজো ইমানুয়েল’ মামলায় তিন ছাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাননি, কিন্তু তাঁরা সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের বহিষ্কারকে সমর্থন করেনি। সেই রায়ের মূল শিক্ষা ছিল— দেশের প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ প্রত্যেক নাগরিককে একই পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে বাধ্য করা নয়।
‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চারটি স্তবক নিয়ে ধর্মীয় ও সাংবিধানিক আপত্তির প্রশ্নও এই মামলায় উঠেছে। কিন্তু সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি আদালত এই পর্যায়ে করেনি। বরং তার চেয়ে বড় একটি নীতিগত প্রশ্ন সামনে এসেছে— রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কি ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে?
দেশপ্রেমের শক্তি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিতে। শাস্তির ভয় সেই অনুভূতিকে শক্তিশালী করে না, বরং আনুগত্য ও স্বাধীনতার সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ যেমন
মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য, তেমনই সংখ্যালঘুর বিবেকও সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিদার।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ তাই শুধু ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়— জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষা এবং নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা পরস্পরের বিরোধী হওয়ার কথা নয়। একটি পরিণত গণতন্ত্রের শক্তি সেখানেই, যেখানে দেশপ্রেমের পাশাপাশি মতের ভিন্নতা, নীরবতা এবং বিবেকের স্বাধীনতারও
স্থান থাকে।




