• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 23 September, 2026

মা দুর্গা কোথায় সাজেন, কোথায় ভোজন, কোথায় রাতভর জলসা? কলকাতার তিন বনেদি বাড়ির অজানা কাহিনি

মর্ত্যে দেবী দুর্গার আবাহন ঘিরে শাস্ত্রীয় রীতি, মন্ত্রোচ্চারণ ও পৌরাণিক কাহিনির শেষ নেই। কিন্তু বাঙালির দুর্গাপুজো শুধু আচার-অনুষ্ঠানের

মা দুর্গা কোথায় সাজেন, কোথায় ভোজন, কোথায় রাতভর জলসা? কলকাতার তিন বনেদি বাড়ির অজানা কাহিনি

Image: AI নির্মিত

মর্ত্যে দেবী দুর্গার আবাহন ঘিরে শাস্ত্রীয় রীতি, মন্ত্রোচ্চারণ ও পৌরাণিক কাহিনির শেষ নেই। কিন্তু বাঙালির দুর্গাপুজো শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে লোকবিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য, ভোজন, সঙ্গীত এবং উৎসবের আবহ। সেই লোকায়ত সংস্কৃতিরই এক অনন্য প্রকাশ কলকাতার তিন বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে প্রচলিত একটি প্রবাদে—মা দুর্গা জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে সাজেন, কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে ভোজন সারেন, আর শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাত জেগে নাচ-গান দেখেন।

এই প্রবাদের পিছনেও রয়েছে ইতিহাস। তিন বনেদি বাড়ির পুজোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, আয়োজন এবং ঐতিহ্য থেকেই ধীরে ধীরে এই জনশ্রুতির জন্ম বলে মনে করা হয়। এক বাড়িতে দেবীর সাজসজ্জার জাঁকজমক, অন্য বাড়িতে বিপুল ভোগের আয়োজন, আর তৃতীয় বাড়িতে দীর্ঘ সময় ধরে চলা নাচ-গানের আসর—তিনটি ধারাই যেন বাঙালির শারদোৎসবকে রূপ, রস ও সুরে পূর্ণ করে।

জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি

জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ পরিবারের দুর্গাপুজোর সূচনা ১৮৪০ সালে। এই পুজো শুরু করেছিলেন গোকুলচন্দ্র দাঁ। তাঁর আদি নিবাস ছিল বর্ধমানের সাতগাছিয়ায়। সেখানেও তাঁদের পুজোর স্মৃতি আজও রয়েছে। গোকুলচন্দ্রের দত্তকপুত্র ছিলেন শিবকৃষ্ণ দাঁ। তাঁর সময়কেই দাঁ পরিবারের সমৃদ্ধির যুগ হিসেবে ধরা হয়।

লোহা, কয়লা ও হার্ডওয়্যারের ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির মালিক হন শিবকৃষ্ণ। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে দুর্গাপুজোর জৌলুসও। শিবকৃষ্ণ নিজে সাজগোজের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাই দেবীকেও সেজে তোলার পরিকল্পনা করেন তিনি। ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে বিশেষ কারুকাজ করা পোশাক ও অলঙ্কার আনানো হয়। ভারী সোনালি-রুপোলি জরির কাজের পাশাপাশি সেই সাজে ব্যবহৃত হয়েছিল দামি পাথরও।

দেবীর সেই অপরূপ সাজসজ্জা এতটাই নজর কাড়ে যে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে—মর্ত্যে এসে মা দুর্গা প্রথমে শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতেই সাজেন। সেখান থেকেই প্রবাদের প্রথম অংশের জন্ম বলে মনে করা হয়।

এই বাড়ির পুজোর রীতিতেও রয়েছে বিশেষত্ব। রথের দিন গড়ানকাঠ পুজোর মাধ্যমে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোয় দেবীর মস্তক স্থাপন করা হয়। অন্যান্য দেবদেবীর মস্তক পরে বসানো হয়। পটুয়াদের হাতে তৈরি হয় দেবীর চালচিত্র। দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় ব্যবহার করা হয় ১৩টি শাড়ি ও ১৩টি কাঁসার পাত্র। সাজানো হয় ১০৮টি পেতলের প্রদীপ।

দাঁ পরিবার বৈষ্ণব মতে পুজো করে। তাই এখানে বলির প্রচলন নেই। অষ্টমীর দিন ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো।

 

jorasanko

pic- Statesman

কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়ি

প্রায় ২১৮ বছর আগে কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। এই বাড়িতে পুজো শুরু করেছিলেন রাধাকৃষ্ণ মিত্র। রথের দিন কাঠামো পুজোর পর বাড়িতেই তৈরি হয় দেবীর প্রতিমা। প্রতিমায় ব্যবহৃত ডাকের সাজ আসে কুমোরটুলি থেকে।

প্রতিপদে বোধনের পর সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে কুমারীপুজো। অষ্টমীতে হয় কল্যাণীপুজো। সন্ধিপুজোয় সাধারণত ব্যবহার করা হয় ১০৮টি পদ্ম। নবমীতে থাকে হোম ও প্রদক্ষিণের বিশেষ আয়োজন।

তবে এই বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ ভোগের বিপুল আয়োজন। রোদে শুকনো মুগডাল দিয়ে এখনও তৈরি হয় খিচুড়ি। নৈবেদ্যের তালিকায় থাকে নানা রকম ভাজা সবজি। মাখনের নৈবেদ্যও এই বাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এর পাশাপাশি দেবীকে নিবেদন করা হয় ৩০ থেকে ৫০ মণ চালের নৈবেদ্য।

থাকে নানা ধরনের মিষ্টি, গজা, নিমকি, লুচি, রাধাবল্লভী-সহ আরও নানা পদ। ভোগের এই বিপুল আয়োজন থেকেই প্রচলিত হয়েছে লোককথার দ্বিতীয় অংশ—জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে সাজসজ্জা সেরে মা দুর্গা নাকি ভোজন করতে আসেন অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে।

 

 

 

kumortuli

pic- statesman

 

শোভাবাজার রাজবাড়ি

কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে শোভাবাজার রাজবাড়ির নাম আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজদের বিজয়োৎসবের আয়োজনের দায়িত্ব পড়েছিল রাজা নবকৃষ্ণ দেবের উপর। সেই সময়ই শোভাবাজার রাজবাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। তৈরি হয় ঠাকুরদালান। পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয় নাচ-গান, সাহেব ও অন্যান্য গণ্যমান্য অতিথিদের জন্য পানভোজনের বিপুল আয়োজন।

পরবর্তীতে নবকৃষ্ণ দেবের পরিবারে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই বাড়িতে আলাদা দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়। দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় ১৭৬৮ সালে নবকৃষ্ণ দাদা গোপীমোহনের ছেলে গোপীমোহনকে দত্তক নেন। পরে তাঁর পঞ্চম রানি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে রাজকৃষ্ণের জন্ম হয়। জ্যোতিষীদের পরামর্শে নবকৃষ্ণ দক্ষিণ দিকে নতুন বাড়ি তৈরি করেন। ১৭৯০ সালে সেখানে শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেই সময় সম্পত্তিও ভাগ হয় গোপীমোহন ও রাজকৃষ্ণের মধ্যে। এরপর থেকেই উত্তর ও দক্ষিণের দুই বাড়িতে আলাদা করে দুর্গাপুজো চলে আসছে।

দুই বাড়িতেই রথ বা উলটোরথের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। দু’টি বাড়ির প্রতিমাই ডাকের সাজে একচালার। তবে প্রতিমার রূপে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। রাধাকান্ত দেবের বাড়ির সিংহ সাদা, ঘোড়ামুখো—নরসিংহ নামে পরিচিত। মহিষাসুরের রং সবুজ। রাজকৃষ্ণ দেবের বাড়ির সিংহ স্টিলরঙা এবং মহিষাসুরও সবুজ বর্ণের।

সপ্তমীর সকালে রুপোর ছাতা মাথায় দিয়ে নবপত্রিকাকে বাগবাজারের ঘাটে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়ার রীতি আজও রয়েছে। নিষ্ঠার সঙ্গে হয় সন্ধিপুজো। দশমীর সকালে সম্পন্ন হয় দর্পণ বিসর্জন।

তবে শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি জড়িয়ে আছে, তা হল নাচের আসর। কথিত আছে, এই রাজবাড়িতেই দুর্গাপুজোয় প্রথম বাইজি নাচের আয়োজন করা হয়েছিল। একটানা ১৫ দিন ধরে চলত নাচের আসর। সাহেবরাও সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন।

সেই জাঁকজমকপূর্ণ নাচ-গানের আসর থেকেই জন্ম নেয় আর এক লোককথা—পুজোর রাতে মা দুর্গা নাকি শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাত জেগে নাচ দেখেন।

আসলে এই তিন বাড়ির পুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রবাদের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে কলকাতার পুরনো

 

Durga Puja History: History of the establishment of Durga Puja at Sovabazar Rajbari

 

pic statesman