• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 20 September, 2026

আবার এক কিশোরীর মর্মান্তিক অপমৃত্যু

আবার রাজধানী শহর দিল্লির মাটিতে একটি কিশোরীর দেহ পড়ে রইল। পচন ধরেছিল শরীরে, একটি হাত বিচ্ছিন্ন, শরীরের কিছু অংশ রাস্তার

আবার এক কিশোরীর মর্মান্তিক অপমৃত্যু

আবার রাজধানী শহর দিল্লির মাটিতে একটি কিশোরীর দেহ পড়ে রইল। পচন ধরেছিল শরীরে, একটি হাত বিচ্ছিন্ন, শরীরের কিছু অংশ রাস্তার কুকুরে খুবলে খেয়েছে। এমন অবস্থায় দেহটি দেখে বোঝার উপায় ছিল না— সে মেয়ে না ছেলে। পরে ময়নাতদন্ত জানাল, সে ছিল এক কিশোরী। তার শরীরে ছিল যৌন নির্যাতনের চিহ্ন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত। চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, যাদের মধ্যে
তিনজন নাবালক।
খবরটি পড়তে পড়তে প্রথম যে অনুভূতিটি আসে, তা শুধু ক্ষোভ নয়— এক গভীর লজ্জা। কারণ এই মৃত্যু কেবল একজন কিশোরীর মৃত্যু নয়। এটি আমাদের চারপাশের সেই অন্ধকারের প্রকাশ, যেখানে একটি মেয়ের শরীরকে মানুষ হিসেবে নয়, লোভ ও হিংসার বস্তু হিসেবে দেখা হয়। তার ভয়, তার অসম্মতি, তার বেঁচে থাকার অধিকার— কিছুই অপরাধীদের কাছে কোনও অর্থ বহন করেনি।
আরও বেদনাদায়ক হল, এই কিশোরী অভিযুক্তদের অন্তত একজনকে চিনত বলেই পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। পরিচিত মানুষের উপর বিশ্বাস করেই সে বেরিয়েছিল। সেই বিশ্বাসই যদি মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়, তবে সমাজের নিরাপত্তার ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, টেম্পোর ভিতরে প্রথমে মদ্যপান, তারপর যৌন নির্যাতন এবং শেষে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা— তারপর দেহটি ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়া। এই বিবরণ যতটা নির্মম, তার চেয়েও নির্মম হল এই ভাবনা যে, ঘটনার পরও অভিযুক্তদের মনে একটি মানুষের মৃতদেহের প্রতি ন্যূনতম মানবিকতা জাগেনি।
তদন্তে পুলিশ ৫০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করে একটি টেম্পোর গতিবিধি অনুসরণ করেছে। সেই সূত্রেই চারজনের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছে। অস্ত্র, পোশাক এবং টেম্পোও উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এখন জরুরি হল তদন্তের প্রতিটি স্তর নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা— কে কী করেছে, অপরাধের পুরো ধারাবাহিকতা কী, আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তার কোনও দিক যেন অন্ধকারে না থাকে।
কিন্তু শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা করলেই কি আমাদের দায় শেষ? প্রশ্নটি সেখানেই। কারণ তিনজন অভিযুক্ত নাবালক— এই তথ্যটি বিশেষভাবে ভাবায়। সদ্য কৈশোর পেরোনো কিছু তরুণ কীভাবে এত গভীর নিষ্ঠুরতার মধ্যে প্রবেশ করে? পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি— কোথায় কোথায় আমরা ব্যর্থ হচ্ছি? আইনের বিচার অবশ্যই হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি সমাজকেও নিজের দিকে তাকাতে হবে।
২০১২ সালের ডিসেম্বরের দিল্লির সেই ভয়াবহ নির্ভয়াকাণ্ডের পর দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছিল— নারীর নিরাপত্তা কোথায়? আইন বদলেছে, সচেতনতা বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে। তবু এত বছর পর রাজধানীর মাটিতেই যদি একটি কিশোরীর দেহ এমনভাবে পড়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে শুধু আইন দিয়ে মানুষের ভিতরের অন্ধকার দূর করা যায় না। দরকার মূল্যবোধের শিক্ষা, নারীর প্রতি সম্মান, অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার এবং সবচেয়ে বড় কথা— মানুষকে মানুষ হিসেবে
দেখার শিক্ষা।
ওই কিশোরীর হয়তো অনেক স্বপ্ন ছিল। সে হয়তো জানত না,

যে-দরজা দিয়ে সে সেদিন বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটিই তার জীবনের শেষ দরজা। তার সেই অসমাপ্ত জীবনের কাছে আমাদের কোনও সান্ত্বনা নেই। আছে শুধু এক কঠিন প্রশ্ন— আর কত মৃত্যুর পরে আমরা সত্যিই বদলাব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশ বা আদালতের কাছে নয়। আমাদের প্রত্যেকের কাছেই।