পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিভাজন শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; তার অভিঘাত পড়েছে দলের নাম, প্রতীক এবং নির্বাচনী পরিচয়ের উপরও। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। আপাতত ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক কোনও পক্ষই ব্যবহার করতে পারবে না। ফলে আসন্ন উপনির্বাচনের ময়দানে দুই গোষ্ঠীকেই নতুন পরিচয়ে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী পেয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং খাম প্রতীক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ফুটবল খেলোয়াড়ের প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি মেঘালয় ও ত্রিপুরাতেও দুই গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব নির্বাচনী জটিলতা। একই আসনে তৃণমূলের পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়ে দুই গোষ্ঠীর প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন এবং পৃথক ‘ফর্ম বি’ পেশ করেন। ফলে মনোনয়ন যাচাইয়ের পর্যায়েই প্রশ্ন ওঠে— কোন প্রার্থীকে দলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হিসেবে গ্রহণ করা হবে? এই জটিলতা এড়াতেই কমিশন আপাতত পুরনো নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করেছে। কমিশনের বক্তব্য, এর উদ্দেশ্য ভোটারদের অধিকার রক্ষা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং কোনও পক্ষকে সাময়িকভাবে অন্যায় সুবিধা বা অসুবিধার মুখে না ফেলা।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। এটি চূড়ান্ত রায় নয়, বরং একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। কোন গোষ্ঠী মূল তৃণমূল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং পুরনো নাম ও প্রতীক শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও বাকি। মনোনয়নপত্র বৈধ কি না, সেই বিষয়টিও কমিশন নির্ধারণ করেনি; সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা আইন অনুযায়ী তা স্থির করবেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক ক্ষোভ স্পষ্ট। অন্যদিকে অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কমিশনের পদক্ষেপকে নিয়মসম্মত বলে মন্তব্য করেছেন এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও তৃণমূলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনা করেছেন। তবে কমিশনের নির্দেশে এই রাজনৈতিক মন্তব্যগুলির কোনওটিই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ নেই। বিশেষত, রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে আসা ধর্মীয় ব্যাখ্যাগুলিও কমিশনের সিদ্ধান্তের অংশ নয়।
দলীয় বিভাজনের পর নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন নয়। শিবসেনা, এনসিপি, এআইএডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টির ক্ষেত্রেও এমন বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও প্রতীক সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছে, কোথাও সাংগঠনিক ও আইনসভায় শক্তির তুলনা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজনৈতিক দল গড়ে তুলেছিলেন, তার পরিচয়ের সঙ্গে জোড়াফুল প্রতীক দীর্ঘদিন ধরে অবিচ্ছেদ্য। তাই সেই নাম ও প্রতীকের সাময়িক অনুপস্থিতি নিছক প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; দলের রাজনৈতিক স্মৃতি ও জনপরিচয়ের ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে।
এখন নজর থাকবে পরবর্তী শুনানি এবং কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। দুই গোষ্ঠীকেই নিজেদের সাংগঠনিক ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আদালতের পথও
খোলা থাকবে।
তবে তার আগে ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচন। নতুন নাম, নতুন প্রতীক এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দুই গোষ্ঠীকে ভোটারদের সামনে দাঁড়াতে হবে। যে দলটির পরিচয় একদিন একটি নাম ও একটি প্রতীকের মধ্যেই সহজে চেনা যেত, আজ সেই পরিচয়ই বিভক্ত। রাজনীতির পরিবর্তনশীল চরিত্রের এর চেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়তো আর কিছু হতে পারে না।




