দিল্লির ভোটার তালিকা সংশোধনী নিয়ে হইচই থামছেই না। এবার নোটিসের তালিকায় নাম উঠল আম আদমি পার্টির (Aam Aadmi Party, AAP) প্রধান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়ালের (Arvind Kejriwal)। সমন পেয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। শোনা যাচ্ছে, নোটিস পাঠানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকেও (Rekha Gupta) । এই নোটিস আসলে কী? এর ফলে নাম কি সত্যিই কাটা যাবে? পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতার নিরিখে দেখে নেওয়া যাক।
কেজরীওয়ালের পরিবার
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কেজরীওয়ালের পাশাপাশি নোটিস পেয়েছেন তাঁর স্ত্রী সুনীতা (Sunita Kejriwal), বাবা গোবিন্দ রাম, মা গীতা দেবী এবং ছেলে পুলকিত। উল্লেখ্য, পুলকিতের বয়স ২৫ বছর। পাঁচজনের নোটিসই এসেছে আনম্যাপড উইথ লাস্ট এসআইআর (Unmapped with Last SIR) শ্রেণিতে। জানা যাচ্ছে, কেজরীওয়াল-সহ ওই পার্টের মোট ১১০ জন এই নোটিস পেয়েছেন।
রেখা গুপ্তার নামও কি সত্যিই তালিকায়?
রেখা গুপ্তার বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন অল্ট নিউজের (Alt News) সহ-প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ জুবেইর (Mohammed Zubair)। সংবাদ মাধ্যম দ্য ওয়্যারের (The Wire) অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে, শালিমারবাগ কেন্দ্রের ১২৩ নম্বর অংশে ৫১ বছরের এক রেখা গুপ্তের নাম নোটিসের তালিকায় রয়েছে। ভোটার কার্ডে তাঁর আত্মীয়ের নাম মনীশ গুপ্ত। সমাপতন হল, মুখ্যমন্ত্রীর স্বামীর নামও মনীশ গুপ্ত।
এই ক্ষেত্রে নোটিস পাঠানোর কারণ কী? বলা হচ্ছে, বাবা বা মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম। জুবেইরের দাবি, এই একই কারণে দিল্লিতে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৭৯৫ জন নোটিস পাচ্ছেন।
তবে বিষয়টি এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত নয়। দ্য ওয়্যার মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানিয়েছে। তবে কোনও উত্তর এখনও মেলেনি।
আনম্যাপড আর লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি
আনম্যাপড (Unmapped) মানে ভোটারের তথ্য পুরনো সংশোধনের তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি। কেজরীওয়াল পরিবারের ক্ষেত্রে কেন এই নাম মেলেনি, তার আলাদা ব্যাখ্যা প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিতে নেই।
লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি (Logical Discrepancy) মানে ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতি। বাবা-মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক কম হওয়া তার একটি উদাহরণ। অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এই তকমার পূর্ণ মাপকাঠি এখনও প্রকাশ্যে আনেনি।
সংখ্যাটা কত বড়?
দিল্লির ক্ষেত্রে ৩১ আগস্টের খসড়া ভোটার তালিকায় (Draft Electoral Roll) ভোটার রয়েছেন প্রায় ৯৭ লক্ষ ৫০ হাজার। মৃত, অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত বা দু’বার নাম থাকার কারণে বাদ পড়েছেন প্রায় ৪৭ লক্ষ। মোট ভোটার ছিলেন প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ। অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজনের নাম খসড়া থেকে বাদ।
এবার নোটিসের অঙ্ক। খসড়ায় থাকা ৩৩ লক্ষের বেশি ভোটারকে নোটিসের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লক্ষ ৭৯ হাজারের বেশি আনম্যাপড এবং ১৯ লক্ষ ৩৩ হাজারের বেশি লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির তালিকায়। খসড়ায় থাকা প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের কাছেই নোটিস যাচ্ছে।
নোটিস পেলেই কি নাম বাদ?
না। নোটিস মানে নথি দিয়ে যাচাইয়ের ডাক। নথি জমা দিলে এবং আধিকারিকরা সন্তুষ্ট হলে নাম চূড়ান্ত তালিকায় থেকে যাবে।
দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (Chief Electoral Officer, CEO) অশোক কুমার জানিয়েছেন, দাবি ও আপত্তির শুনানি চলছে বলেই নোটিস পাঠানো হচ্ছে। খসড়ায় নাম না থাকলে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাবি জানানো যাবে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের দিন এখন ৪ নভেম্বর। দিল্লির সময়সূচি এ পর্যন্ত তিনবার বদলেছে।
সুপ্রিম কোর্টে কী হতে পারে?
নোটিস নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) পৌঁছে গিয়েছে। আবেদনকারী অঞ্জলি ভরদ্বাজ (Anjali Bhardwaj) ও অমৃতা জোহরি। তাঁদের হয়ে সওয়াল করছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণ (Prashant Bhushan)। তাঁদের দাবি, নোটিস পাওয়া ভোটারদের নাম, ঠিকানা ও নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করতে হবে। লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির সংজ্ঞা স্পষ্ট করারও আর্জি রয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ মামলাটি শুনবে মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর।
শুনানির আগেই কমিশন ৩৩ লক্ষ ভোটারের তালিকা প্রকাশ করেছে। শনিবার ভোটার অধিকার মঞ্চ (Voter Adhikar Manch) মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে প্রক্রিয়ার সময়সীমা দু’মাস বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। আধিকারিক জানিয়েছেন, বেশির ভাগ দাবিই তিনি বিবেচনা করবেন।
বাংলার কাছে এই ছবি কতটা চেনা?
খুবই চেনা। গত ডিসেম্বরে বাংলার খসড়া তালিকা থেকে ৫৮ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছিল। ৩১ লক্ষের বেশি ভোটার ছিলেন আনম্যাপড, তাঁদের শুনানি চলে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। শুনানিতে ১২টি নথির যে কোনওটি দেখানো যেত। কিন্তু কেবলমাত্র আধার কার্ড যথেষ্ট ছিল না।
তুলনায় দিল্লির অঙ্ক আরও বড়। তৃতীয় পর্বের এসআইআরে খসড়া থেকে বাদ পড়ার হারে দিল্লি এক নম্বরে, প্রায় ৩৩ শতাংশ। বাংলায় খসড়া থেকে বাদ পড়েছিলেন ৭.৭ শতাংশ ভোটার। ওই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বাংলায় প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে বিচার চলে। শেষ পর্যন্ত ২৭ লক্ষ নাম বাদ যায়। এই হিসেব দিল্লির নোটিস পাওয়া ভোটারদের ভবিষ্যৎ আন্দাজ করতে কাজে লাগতে পারে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নোটিস পাওয়ার একই তালিকায় রয়েছে বিরোধী শিবিরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পরিবার এবং শাসক শিবিরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নাম। তাতে অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার। প্রশ্নটা এখন আর কোনও ব্যক্তি বা দলের নয়। প্রশ্নটা পদ্ধতির স্বচ্ছতার।
নোটিস পেলে কী করণীয়?
প্রথমে দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওয়েবসাইটে নোটিস পাওয়া ভোটারদের তালিকায় নিজের নাম খুঁজে দেখুন। নোটিসে নাম থাকলে নির্ধারিত কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিন। খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে ফর্ম ৬ (Form 6) জমা দিন। ভুল করে মৃত বা অনুপস্থিত দেখানো হলে নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের কাছে লিখিত আবেদন করুন। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জানিয়েছেন, সেক্ষেত্রে ভুল শুধরে দেওয়া সম্ভব।
এখন নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে। মঙ্গলবার নোটিসের কারণ, মাপকাঠি আর সময়সীমা নিয়ে কী নির্দেশ আসে, সেটাই ঠিক করবে দিল্লির লক্ষ লক্ষ ভোটারের পরের পদক্ষেপ।




