কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে— একদিন কি এআই মানুষের অস্তিত্বের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠবে? যন্ত্র কি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে? ভবিষ্যতে কি এমন কোনও সময় আসবে, যখন মানুষ নিজের তৈরি প্রযুক্তির কাছেই অসহায় হয়ে পড়বে?
প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি একটি প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে— ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তার আগে আজ আমরা এআই-কে কতটা বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই আরও গুরুতর করে তুলেছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা একাধিক এঅই এজেন্ট নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে একটি যৌথ গোষ্ঠীর মতো আচরণ করেছে, নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে এবং এমন কিছু কাজ করেছে যা তাদের দেওয়া নির্দেশের সীমার বাইরে। আশ্চর্যের বিষয়, তারা মানুষের কাছে নিজেদের আচরণের কথা জানায়নি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, মানুষও বেশ কিছুদিন ধরে বিষয়টি বুঝতে পারেনি। অর্থাৎ সমস্যা এই নয় যে এআই একদিন হয়তো মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। সমস্যা হল, কিছু পরিস্থিতিতে এআই এখনই এমন আচরণ করতে পারে যার কারণ, উদ্দেশ্য বা পরিণতি মানুষ সহজে বুঝতে পারে না।
এই অস্বচ্ছতাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। এআই-এর বিপদ সবসময় যে সিনেমার মতো ভয়াবহ হবে, এমনও নয়। কোনও রোবট মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা না করেও বিপুল ক্ষতি করতে পারে। একটি ভুল নির্দেশ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি সফটওয়্যারের সামান্য ত্রুটিই কখনও কখনও যথেষ্ট।
বেঙ্গালুরুর ‘মিথিক সোসাইটি’ (Mythic Society)-র একটি প্রকল্পে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। একটি এআই-নির্ভর কোডিং ব্যবস্থার ভুল কমান্ডের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল নথি মুছে যেতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকল্পের প্রায় ১৫ শতাংশ তথ্য হারিয়ে যায়। এর মধ্যে ছিল ঐতিহাসিক শিলালিপি, মন্দির, বীরশিলা ও মুদ্রার ছবি। যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য যেমন আছে, তেমনই আছে অপূরণীয় ঐতিহাসিক ক্ষতির আশঙ্কা। হারানো একটি ডিজিটাল ফাইল হয়তো আবার তৈরি করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া একটি পুরনো প্রত্নসম্পদের ছবি সবসময় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
এখানেই এআই নিয়ে আমাদের ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দরকার। আমরা প্রায়ই ‘এআই সেফটি’ বলতে ভবিষ্যতের কোনও মহাবিপর্যয় ঠেকানোর কথা বুঝি। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নটি আরও দৈনন্দিন। এআই যদি কোনও হাসপাতালের তথ্য ভুলভাবে পরিবর্তন করে? কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি মুছে দেয়? আর্থিক ব্যবস্থায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়? অথবা কোনও গবেষণার ফলকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা মানুষ সঙ্গে সঙ্গে ধরতেই পারল না? তখন দায় নেবে কে?
প্রযুক্তির ইতিহাসে এই প্রশ্ন নতুন নয়। পরমাণু বিজ্ঞানের ইতিহাসও আমাদের একই ধরনের শিক্ষা দেয়। পরমাণুর শক্তি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যেমন চিকিৎসা, শক্তি উৎপাদন ও বিজ্ঞানের নতুন দরজা খুলেছে, তেমনই সেই জ্ঞান যুদ্ধের হাতে পড়ে ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে এনেছে। বিজ্ঞানী ফ্রিৎস হাবারের জীবন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সার তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান পৃথিবীর খাদ্যসংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অথচ তিনিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ কোনও আবিষ্কার নিজে সম্পূর্ণ ভালো বা মন্দ নয়। তার ব্যবহার নির্ভর করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজের উপর। কিন্তু
এআই-এর ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত সমস্যা রয়েছে— এখানে অনেক সময় মানুষ নিজেই জানে না, যন্ত্রটি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট
সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
এই কারণেই শুধু প্রযুক্তিবিদদের হাতে এআই-এর ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। এআই তৈরি হবে প্রযুক্তির সাহায্যে, কিন্তু তার ব্যবহার নির্ধারিত হবে সমাজের মূল্যবোধ দিয়ে। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি দর্শন, ইতিহাস, আইন, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান এবং নৈতিক চিন্তারও প্রয়োজন রয়েছে।
মানুষের একটি বড় শক্তি হল সে নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করতে পারে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের চিন্তায় এই উপলব্ধি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ— জ্ঞানী হওয়ার প্রথম শর্ত নিজের না-জানাকে জানা। এআই-এর যুগে এই বিনয় আরও জরুরি। যন্ত্র যদি দ্রুত উত্তর দিতে পারে, তার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি উত্তর সঠিক। আর কোনও উত্তর সঠিক হলেও, সেই উত্তর ব্যবহার করা উচিত কি না— সেটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।
এইখানেই মানবিক বিদ্যার গুরুত্ব। সাহিত্য আমাদের মানুষের জটিলতা বুঝতে শেখায়, ইতিহাস দেখায় একটি সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি, দর্শন প্রশ্ন করতে শেখায়, আর আইন বলে দেয় ক্ষমতার সীমা কোথায়। প্রযুক্তি আমাদের বলে দিতে পারে কী করা সম্ভব; কিন্তু কী করা উচিত, সেই সিদ্ধান্ত এখনও মানুষের।
এআই-এর গতি যত বাড়বে, মানুষের চিন্তার দায়িত্ব ততই বাড়বে। দ্রুত উত্তর পাওয়া আর সঠিক প্রশ্ন করা এক জিনিস নয়। বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হতে পারে—যন্ত্রের দেওয়া উত্তরকে থামিয়ে তার ভিত্তি, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন করা। তাই এআই-কে ভয় পাওয়ার চেয়ে তাকে বোঝা বেশি জরুরি। অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও বিপজ্জনক, আবার অকারণে আতঙ্কিত হওয়াও নয়। দরকার স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং মানুষের চূড়ান্ত তদারকি।
মানুষের ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার আমাদের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা যত বেড়েছে, দায়িত্বও তত বেড়েছে। এআই সেই পুরনো সত্যটিকেই নতুন করে সামনে আনছে। আসল বিপদ হয়তো এমন কোনও যন্ত্র নয়, যে একদিন মানুষকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেবে। আসল বিপদ হতে পারে এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ নিজের তৈরি শক্তিশালী প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে বুঝতে না পেরেও তার উপর নির্ভর করতে শুরু করবে। ভবিষ্যতের বিপর্যয় নিয়ে কল্পনা করার আগে তাই বর্তমানের এই প্রশ্নটিই আমাদের সামনে রাখা উচিত— আমরা যে বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছি, তাকে কি সত্যিই আমরা বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি?




