• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 14 September, 2026

ভাঙা পিঠ নিয়ে ইরানে ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপন, মার্কিন সেনার রোমহর্ষক উদ্ধার

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে গভীর রাতে দুর্ঘটনার খবর দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ব্রাভোকে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে। অভিযানে বহু সেনা, যুদ্ধবিমান ও ড্রোন নামানো হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের মাটিতে ৯০-র বেশি সেনা এই অভিযানে সরাসরি মোতায়েন করা হয়েছিল।

ভাঙা পিঠ নিয়ে ইরানে ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপন, মার্কিন সেনার রোমহর্ষক উদ্ধার

Photo: Statesman

আকাশে ছিটকে গিয়েছিল প্যারাশুট। নীচে শত্রুর দেশ। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল পিঠ, হাত ও কাঁধ। শরীর থেকে তখন ঝরছে রক্ত। তবু থামেননি মার্কিন বিমানবাহিনীর এক কর্নেল। ইরানের মাটিতে প্রায় ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপন করে, কখনও পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে তো কখনও অবস্থান বদলে ইরানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরলেন তিনি। সম্প্রতি সিবিএস-এর ‘সিক্সটি মিনিটস্’ অনুষ্ঠানে নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ওই মার্কিন অফিসার। নিরাপত্তার কারণে তাঁকে ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচয় করানো হয়েছে।

ঘটনাটি চলতি বছরের ২ এপ্রিলের। ইরানের ইস্ফাহানের দক্ষিণে পাহাড়ি এলাকায় অভিযানে গিয়েছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল। দুই আসনের ওই যুদ্ধবিমানে ছিলেন পাইলট ‘আলফা’ এবং ওয়েপন সিস্টেমস অফিসার ‘ব্রাভো’। আচমকাই ইরানের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত লাগে বিমানে। ব্রাভোর কথায়, মনে হয়েছিল যেন প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা একটি মালবাহী ট্রেন বিমানটিকে ধাক্কা মেরেছে। বিমানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় দু’জনকেই ইজেকশন সিটের সাহায্যে বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।

পাইলট আলফা তুলনামূলকভাবে নিরাপদে মাটিতে নামতে সক্ষম হন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী। কিন্তু বিপদ বাড়ে ব্রাভোর। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাঁর প্যারাশুট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মাঝআকাশে তিনি দেখতে পান সেটি ঠিকমতো খুলছে না। কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় মাটিতে আছড়ে পড়েন তিনি। ভেঙে যায় পিঠের শিরদাঁড়া ও একটি হাত। কাঁধেও গুরুতর চোট লাগে। মাথা ও মুখ কেটে গিয়ে শুরু হয় রক্তপাত।

কিন্তু তখনই নিজেকে সামলে নেন ব্রাভো। বুঝতে পারেন, এক জায়গায় পড়ে থাকলে ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়বেন। তাঁর খোঁজে তখন পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ১,৫০০ ইরানি সেনা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য তল্লাশি চালাচ্ছিলেন বলে জানান তিনি। ইরানের জাতীয় টেলিভিশনেও তাঁকে নিয়ে খবর প্রচারিত হচ্ছিল।

ভাঙা পিঠ ও হাত নিয়েই পাহাড় বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু এলাকায় উঠে যান ব্রাভো। একটি পাহাড়ি খাঁজে আশ্রয় নিয়ে টানা দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকেন। খাবার ও জল প্রায় ছিল না। ঠান্ডায় চোটের যন্ত্রণা আরও বাড়ছিল। তবু মাঝেমধ্যে জায়গা বদল করে এবং গোপনে সঙ্কেত পাঠিয়ে নিজের অবস্থান জানানোর চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।

এদিকে আমেরিকায় শুরু হয়ে যায় তাঁকে উদ্ধারের বিশাল অভিযান। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে গভীর রাতে দুর্ঘটনার খবর দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ব্রাভোকে যেভাবেই হোক ফিরিয়ে আনতে হবে। অভিযানে বহু সেনা, যুদ্ধবিমান ও ড্রোন নামানো হয়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের মাটিতে ৯০-র বেশি সেনা এই অভিযানে সরাসরি মোতায়েন করা হয়েছিল। ব্রাভোর অবস্থান খুঁজে বার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সিআইএ। ব্যবহার করা হয় গোপন নজরদারি প্রযুক্তি। ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে চালানো হয় নানা কৌশলও।

আরও পড়ুন: বিশ্বে জ্বালানি সঙ্কট বাড়ছে, জেলেনস্কিকে সতর্ক করলেন ট্রাম্প 

শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর ব্রাভোর কাছে পৌঁছয় মার্কিন উদ্ধারকারী দল। গুরুতর চোট নিয়েও বেঁচে থাকা ওই অফিসার উদ্ধারকারীদের দেখে শুধু বলেন, ‘চলো যাওয়া যাক।’ পরে স্ত্রীকে ফোন করে জানান, তিনি বেঁচে আছেন। গোটা ঘটনাকে তিনি শুধু নিজের বেঁচে ফেরার কাহিনি হিসেবে দেখছেন না। তাঁর কথায়, এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ। সহযোদ্ধাদের আস্থা এবং কাউকে পিছনে না ফেলে ফেরার সামরিক প্রতিশ্রুতির গল্প।