• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 13 September, 2026

ব্রিকস : সংলাপের মঞ্চ

ব্রিকস ভারতের কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়, কূটনৈতিক কৌশলেরও একটি পরীক্ষা। ভারতকে এমন একটি সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যা স্লোগানের চেয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানে বেশি কার্যকর। জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও সরবরাহ-ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগই ব্রিকস-এর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

ব্রিকস : সংলাপের মঞ্চ

Photo: ANI

যুদ্ধ, জ্বালানি-সংকট, বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপে আজকের বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। একদিকে পুরনো আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে এমন একটি মঞ্চ, যেখানে মতের মিলের পাশাপাশি মতভেদের কথাও বলা যায়।

ব্রিকস-এর সম্প্রসারণের ফলে সংগঠনটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। নতুন সদস্যদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশ একই মঞ্চে থাকলেও তাদের আঞ্চলিক স্বার্থ সবসময় এক নয়। ফলে ব্রিকসকে একক রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর শক্তি নিহিত রয়েছে বিভিন্ন স্বার্থের দেশকে একই আলোচনার টেবিলে বসাতে পারার মধ্যে।

এই জায়গাতেই ভারতের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। অর্থাৎ কোনও একটি শক্তিশালী দেশের শিবিরে পুরোপুরি না গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। বর্তমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এই নীতি ভারতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ, চিন কিংবা পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ধরন এক নয়। তাই এমন একটি মঞ্চ ভারতের পক্ষে মূল্যবান, যেখানে ভিন্নমতের দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব।

ব্রিকসের ক্ষেত্রে ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো। সরবরাহ-শৃঙ্খলকে আরও নির্ভরযোগ্য করা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিরাপদ জোগান নিশ্চিত করা, জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো এবং নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্যের সুযোগ প্রসারিত করা— এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সদস্য দেশগুলির জন্য বাস্তব সুবিধা আনতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় যখন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা ক্রমশ রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে, তখন বিকল্প বাণিজ্যিক পথ তৈরি করা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ব্রিকসকে যদি পশ্চিম-বিরোধী জোটে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা কমবে। ভারতের স্বার্থও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রিকসের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিশ্বকে দুই শিবিরে ভাগ করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ করার দাবি জোরদার করা। বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার বা জাতিসঙ্ঘের মতো প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। ব্রিকস সেই সংস্কারের দাবি তুলতে পারে।

এই সম্মেলনে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও বিশেষ নজরে থাকবে। সীমান্তে উত্তেজনা কমলেও দুদেশের মধ্যে অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চিনের উপর ভারতের নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে, অথচ ভারতের বহু শিল্পের সরবরাহ-শৃঙ্খলে চিনা পণ্যের উপস্থিতি এখনও যথেষ্ট। ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা— দুই বাস্তবতাকেই একসঙ্গে সামলাতে হবে।

এই কারণেই ব্রিকস ভারতের কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়, কূটনৈতিক কৌশলেরও একটি পরীক্ষা। ভারতকে এমন একটি সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যা স্লোগানের চেয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধানে বেশি কার্যকর। জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ও সরবরাহ-ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগই ব্রিকস-এর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

সফল সম্মেলনের মাপকাঠি তাই কতগুলি রাজনৈতিক বিবৃতি প্রকাশিত হল, তা নয়। বরং সম্মেলনের পর ভারত কতটা বেশি কূটনৈতিক স্বাধীনতা পেল, কতটা কমল অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং কতগুলি নতুন সংলাপের দরজা খুলল— সেটিই আসল প্রশ্ন। মতের মিল যেমন থাকবে, তেমনই মতবিরোধও থাকবে। কিন্তু মতবিরোধের মধ্যেও কথা বলার পথ খোলা রাখা— আজকের বিভক্ত বিশ্বে সেটিই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।