পাভেলের পরিচালনায় আসছে নতুন ছবি, ‘ডাক্তারকাকু’। মুখ্য ভূমিকায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ছবি মুক্তির আগে একান্ত আড্ডায় অভিনেতা।
প্রশ্ন: ‘ডাক্তারকাকু’ দিলীপ সাহা। তাঁর কাছে তো পেশাটা শুধু জীবিকা নয়, বরং ধর্মের মতো। ডাক্তারকাকুর ম্যানারিজমটা কেমন? বিশেষ কারুর থেকে নেওয়া না প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় যেমন দেখতে চান তেমন?
প্রসেনজিৎ: ডাক্তার বললে আমার কাছে প্রথম নাম পার্থ মামা। আমরা যখন দমদমে থাকতাম, পার্থ মামা হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন। মানে আমার দাদুকেও দেখতেন, ঠাকুরদাকেও দেখতেন, আমাদেরও ছোটবেলায় দেখতেন। হাউস ফিজিশিয়ান যেমন হন। পার্থ মামা আমার বোনকেও জন্ম দিয়েছেন। যতদিন উনি ছিলেন, আমরা পার্থ মামা বলতাম। মা-রা ভাইফোঁটা দিত।
প্রশ্ন: বাহ…
প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ, ডাক্তাররা পরিবারের একজন হয়ে যেতেন। কিছু হলেই ডক্টর আঙ্কল। আর ওঁর মুখে সর্বদা হাসি থাকত। রাত দুটোর সময় ডাকলেও হাসি, ভোরবেলায় ডাকলেও হাসি। একগাল হাসতেন। ওইটা আমার মাথার মধ্যে খুব স্ট্রংলি ঢুকে আছে। এখন আমাদের যেমন ডা. শীল আছেন। মিশুক জন্ম থেকে ডক্টর আঙ্কল বলেই ডাকে…মানে সেই ডাক্তারকাকু। মিশুক যখন জন্মেছে, অর্পিতাকে তো হাসপাতালে উনিই নিয়ে গেছেন। আমি পরে পৌঁছেছি। আমার ছেলের ২১ বছর বয়স হয়ে গেল, ও কিন্তু ডক্টর আঙ্কলই বলে। এই হল ডাক্তার-পেশেন্টের সম্পর্ক…অনর্থক ভয় পাইয়ে দেওয়া নয়। বড় ডাক্তাররা তো ম্যাজিশিয়ান!
প্রশ্ন: ঠিক…
প্রসেনজিৎ: এই চরিত্রটা প্রথম শোনার পর আমার মনে হয়েছিল ডা. বিধান চন্দ্র রায়কে কোথাও এই ছবিটার মধ্যে দিয়ে ট্রিবিউট দেওয়া হচ্ছে। যে মানুষটা অনেককেই দেখে বলতেন, না তোমার এটা হয়নি। তুমি এটা খাও, এটা করো ঠিক হয়ে যাবে। তাঁকে এই জন্য ম্যাজিশিয়ান বলা হত। সব মিশিয়ে চরিত্রটাকে আমি আমার মতো তৈরি করেছি। আর একটা অবশ্যই আমার তথা সব বাঙালির প্রিয় ছবি ‘অগ্নীশ্বর’। কিন্তু ওটা ছিল গ্রামে গিয়ে করা। কিন্তু দিলীপ সাহা বলেন, সবাই যদি একটা শ্রেণীর চিকিৎসা করে তাহলে যাদের কাছে সেই অর্থটা নেই তাদের চিকিৎসা কে করবে?
প্রশ্ন: আমরা সবসময়ই ডাক্তারদের হয় ঈশ্বর বানাই, নয়তো কাঠগড়ায় তুলি। এই ছবি কি সেই ঈশ্বরত্ব ভেঙে ডাক্তারদের রক্তমাংসের দুর্বলতা সামনে আনবে?
প্রসেনজিৎ: একদম। কাঠগড়ায় তোলাটায় আমি একদম বিশ্বাস করি না। দেখো, কর্পোরেটাইজেশন সব জায়গায় হচ্ছে, আর তাতে কোনো অন্যায় আমি দেখি না। আবার এও ঠিক, আমাদের দেশকে যদি উন্নতি করতে হয়, চিকিৎসা আর শিক্ষা সবার জন্য থাকতে হবে। আর মানুষ ডাক্তারদেরকে ঈশ্বর ভাবে। আমাদের কারো কিছু হলে ডাক্তারকে সবথেকে আগে ফোন করব। ঈশ্বরের পরেই জীবনে ডাক্তারের স্থান। কারণ এই বিশ্বাসটা যে, আমি মিসগাইডেড হব না। এবার মিসগাইড কি তারা ইচ্ছে করে করেন? না। পরিস্থিতি। সেটার একটা ট্র্যাকও আছে ছবিতে।
প্রশ্ন: অসুস্থ মানুষের পাশাপাশি একজন ডাক্তার প্রায়ই অসুস্থ সমাজের মুখোমুখি হন…
প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ। অসুস্থ সমাজের কিছু দারুণ দৃশ্য আছে ছবিতে। দেখো এখন সাইকোলজি, সাইকিয়াট্রিস্ট খুব নরমাল। কিন্তু ডাক্তারদের তো একটা ভূমিকা আছে। একটা সময়ে তো ডাক্তাররা অভিভাবক হয়ে যায়। যদি বাড়িতে অশান্তি হয়ে কেউ অসুস্থ হয়, তিনি কিন্তু বুঝতে পারেন পেশেন্ট স্ট্রেসড হচ্ছে। তখন তার একটা দায়িত্বও সেটা নিয়ে কথা বলার। এই ডাক্তার এরকমই।
প্রশ্ন: একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা…
প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ। আমি অভিনেতা হলেও আমার একটা বেসিক সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি তো আছে। বেসিক। সেটা কিন্তু যেকোনো প্রফেশনের মানুষেরই আছে।
প্রশ্ন: আর একটা কালেক্টিভ মোরালিটির জায়গাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো?
প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ দেখায়। সেটা তো তাঁর ছেলেকেই দেখায়।
প্রশ্ন: আজকের সময়ে প্রায় প্রতিটা পেশার সঙ্গেই কমার্শিয়াল প্রেশার জড়িয়ে…পেশার প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা কতটা সম্ভব বলে মনে কর?
প্রসেনজিৎ: দেখো, এটা ব্যালান্স করতে হয়। আমরা এখন যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি সামাজিকভাবে, কিছু জায়গায় তো নিশ্চয়ই আমরা সেই চেষ্টাই করি। কিন্তু আমার একটা বক্তব্য, আমরা শহরের মল দেখছি, বড় বিল্ডিং দেখছি। কিন্তু আমি এখনও জানি পুরুলিয়ার একটা গ্রামে চলে যাও, এমন অনেক বাড়ি আছে যেখান থেকে মহিলাদের একটা শাড়ি পাল্টে আরেকটা শাড়ি পরে বেরোতে হয়। তাদের কথাটা কিন্তু ভাবতে হবে। এটা শুধু চিকিৎসার জায়গা থেকে বলছি না, সব ক্ষেত্রে। এডুকেশন আজ খুবই কস্টলি বিষয়। কিন্তু আমরা যদি দেশের উন্নতির কথা ভাবি, তাহলে কিন্তু সব শ্রেণীর মানুষের কাছে পড়াশোনাটা পৌঁছতে হবে।
প্রশ্ন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য…একদমই।
প্রসেনজিৎ: এই লড়াইটা তো আজকের নয়, বহু বছরের লড়াই। যখন যে সরকারে এসেছে আমি একটাই কথা বলেছি, আমাদের বাড়ির ছেলেদের যেন বাইরে না যেতে হয়। চিকিৎসা এবং শিক্ষার সুযোগটা যেন, যাদের সেই অর্থবলটা নেই…তারাও পান। চেষ্টা যে কেউই করেন না তাও না। করছেন সবাই চেষ্টা।
প্রশ্ন: যখন একজন বাবা বুঝতে পারেন তাঁর সন্তান অজান্তেই এই সামাজিক ভাইরাসের অংশ হয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর মানসিক অবস্থান কেমন হয়?
প্রসেনজিৎ: আমি আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বলতে পারব না, তবে এই ছবিতে ভয়ানক জায়গায় যায়। দুঃখ পায়, রাগ করে, ভেঙে পড়ে। বাকিটা ছবিতে দেখতে হবে।
প্রশ্ন: এর আগে ‘আয় খুকু আয়’-তে একদম অন্যরকমের একটা বাবার চরিত্র করেছিলে…
প্রসেনজিৎ: কেন…’চলো পাল্টাই’-ও করেছি।
প্রশ্ন: সাইকোলজিক্যালি তিনজন বাবা একদম আলাদা না একই?
প্রসেনজিৎ: ডেফিনেটলি আলাদা। ‘চলো পাল্টাই’-এর বাবা মনে করে পড়াশোনাটাই করা উচিত আর কিছু নয়। ‘আয় খুকু আয়’-এর লড়াই ছিল মেয়েকে আমি প্রোটেক্ট করব। একজনের ফ্যান হয়ে আমি অর্থনৈতিক, মানসিক সবরকম ভাবে শেষ হয়ে গেছি, তুমি ওটাতে ঢুকো না। এই ছবিটা আরেকটু গভীর। এখানে একটা ক্ষোভ, ভ্যালুজের দ্বন্দ্ব।
প্রশ্ন: একজন বাবা তাঁর সন্তানের জন্য কী উত্তরাধিকার রেখে যান বলে তোমার মনে হয়?
প্রসেনজিৎ: ভাল প্রশ্ন। আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে মনে হয়, প্রত্যেক বাবার নিজস্ব একটা স্বপ্ন থাকে। ৭০-৮০ বছর বয়সের মধ্যে সবটা পূরণ হয় না। সেই স্বপ্নগুলো ছেলেকে দিয়ে যাওয়া, যদি সে সেটা তার মতো করে পূরণ করতে পারে।
প্রশ্ন: কিন্তু একজন বাবার কি কখনো বলে ওঠা হয় যে আমি চাই তুই এটা কর? না ছেলেকেই নিজে বুঝে নিতে হয়?
প্রসেনজিৎ: বাবা-ছেলের মধ্যে যদি বন্ধুত্বের বন্ডিং হয় তাহলে হয়। বাবা ছেলের সম্পর্কটা তো বন্ধুত্বের মতো সেটা যদি হয়। মানে ছেলে আর বাবার মধ্যে একটা ডিসট্যান্স এমনিতেই থাকে। মানে, মা-ছেলের যেটা হয় সেটা বাবা-ছেলের হয় না। কারণ একটা বয়সের পর ছেলে বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্নগুলো ঠিকই রিফ্লেক্ট করে। আমি এগুলো করতে পারলাম আর এগুলো পারলাম না…তুই চেষ্টা করিস, আমি আছি। এটা তো বাবারা বলেই। নরম্যাল। আর এটা যেকোনো পেশাতেই।
প্রশ্ন: তুমি জীবনে ৪০০-র বেশি ছবিতে নায়ক হয়েছ। আজকে ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে তোমার কাছে ‘নায়ক’ শব্দের সংজ্ঞা কী?
প্রসেনজিৎ: নায়ক…আসলে নায়ক কথাটাই না অদ্ভুত। এখন আমার মনে হয়, নায়ক তো আছিই…তার সঙ্গে একটা ব্র্যাকেটে কোথাও অভিনেতাটাও যুক্ত হয়েছে। মানে অভিনয়ও উনি পারেন। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমাদের দেশে নায়কদের যেন একটা আলাদা স্ট্যাম্প করে দেওয়া হয়। কিছু নায়ক আছেন, যাঁরা সেই স্ট্যাম্প থেকে বেরিয়েছেন।
আমার ছেলে বলছিল, বাবা, মুম্বইতে আর কাউকে নিয়ে কিছু পড়াক না পড়াক ঘুরে ফিরে অমিতাভ বচ্চনের রেফারেন্স আসেই। তার মানে ভাবো, মানুষটা কতটা কনটেম্পোরারি হয়ে আছেন! আমার কাছে নায়ক শব্দটা এমন: আমি আজকে নায়ক থাকলেও আমার কাজের যে নায়কত্ব আগামী ২৫-৩০ বা ৪০ বছর পরেও যেন সেটার রিফ্লেকশন হয়।
প্রশ্ন: চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত সততা নিয়ে যখন দেশজুড়ে বিতর্ক, সেই আবহে এই ছবি কতটা সময়োপযোগী? ছবিটা রিলিজ হতে যদিও দেরি হল…
প্রসেনজিৎ: দেরি তো হয়েইছে। তা সত্ত্বেও এই ধরনের গল্পগুলো সব সময়ের জন্যই। ২৫ বছর আগেও এই গল্প বলা দরকার ছিল, ২৫ বছর পরেও গল্পটা বলা দরকার।
প্রশ্ন: এই ছবিটা যদি দর্শকদের মনে একটা প্রশ্ন রেখে যায় তোমার মতে সেটা কী হওয়া উচিত?
প্রসেনজিৎ: আমার তো মনে হয় যে ছবিটা দেখে ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন মানুষ এই ডাক্তারকাকুকে চিনতে পারবেন। আর অধিকাংশ মানুষ ভাববেন, ইশ্! আমাদের পাড়ায় যদি এরকম একজন ডাক্তারকাকু থাকতেন! ডাক্তারকাকু আসলে শেষ হচ্ছে না…একটা লেগ্যাসি রেখে যাচ্ছে। সেটা ছবিতেই দেখতে হবে।
প্রশ্ন: এবারের পুজোর আগে তোমাকে আমরা বারবার অভিভাবকের জায়গায় দেখছি। তুমি পুরো টলিউডকে এক জায়গায় নিয়ে আসছ। এবারের বাংলা ছবির পুজো প্ল্যান কী আর তোমার পুজোর প্ল্যান কী?
প্রসেনজিৎ: পুজোয় চারটে দারুন দারুন ছবি আসছে। এই বছরে পুজোর ছুটিও খুব লম্বা যা শুনছি। গত বছর পুজোয় ঠিক যতটা এক্সপেক্টেশন ছিল ততটা হয়নি সবকিছু মিলিয়ে।তবে একটা কোথাও ফেস্টিভ মুড এসেছে। আমার মন বলছে, প্রায় ৪০-৫০ কোটি টাকার ব্যবসা এবার চারটে ছবি মিলিয়ে হবে। চারটে ছবিই যতটাই চলবে পুরোটাই আমাদের ইকোনমি। কারণ, আমাদের বাংলা ছবির যে টোটাল ইকোনমিক সিনারিওটা সেটা খুব স্বস্তির জায়গায় নেই। কিন্তু আমরা সবাই মিলে যদি ইকোনমিটাকে বড় জায়গায় নিয়ে যেতে পারি এই পুজো থেকে, তবে লিখে দিচ্ছি আগামী দু বছর পরের পুজো হবে একটা বিশাল ভলিউমে। অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার ছবি নিয়ে যে ভীষণ উত্তেজনা, সেটা বাংলা ছবি নিয়েও হবে। আর পুজোটা আমি খুব এনজয় করব।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন, শতবর্ষে এসে উত্তমকুমার কি আবার কিছুটা বিচ্ছিন্ন হওয়া বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে মিলিয়ে দিয়ে গেলেন? আর সেই উত্তরাধিকার কি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের হাতেই?
প্রসেনজিৎ: না না না সেটা নিয়ে স্টেজও বললাম দেখো মহানায়ক উত্তমকুমারই পারেন। উনি তো বটগাছ ছিলেন, এখনও আছেন। এই সবাইকে এক করা। আর ওই ছোটবেলাটা করেছিলাম বলে, হয় না যে…এই তুই এটা দেখ, এরকম একটা বলেছেন কোথাও থেকে। আমার মনে আছে, এই পুরো নন্দনে সবাই ছিল, যারা দিনরাত প্রায় দুর্গাপূজোর মতো করে কাজ করেছে। কেউ বাড়ি যায়নি। তিন তারিখের আগের আগের দিন কলকাতা শহরে যে বৃষ্টিটা হয়েছিল, আমাদের খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি বলেছিলাম, চিন্তা করিস না…আমি ছোটবেলা বড়বেলার সাথে কথা বলছি। এত মানুষের আন্তরিক পরিশ্রম। এখানে কোনো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কেউ কাজ করেনি। উত্তমজেঠু তো উপর থেকে দেখছেন। দেখবি আমাদের স্বপ্নগুলো ঠিক পূরণ হবে। সেটা পূরণ হয়েছে।




