দলীপ ট্রফিতে পূর্বাঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছিল সময়ের অপেক্ষা। সেই সময় এসে গেল বৃহস্পতিবার দুপুরে, যখন তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৮৮-৭ তুলে ইনিংস ঘোষণা করে দেন পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক ইশান কিষাণ। অনুকুল রায় আউট হওয়ার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেন ইশান। তার পরেই দক্ষিণাঞ্চলের অধিনায়ক তিলক বর্মা এসে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেন। কারণ, দুই ইনিংস মিলিয়ে প্রায় এগারোশো (১০৯৬) রান তোলা পূর্বাঞ্চলের থেকে তারা ৭৬০ রানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় আর ব্যাট করতে নেমে কোনো লাভ হত না তাদের। তাই ড্র স্বীকার করে নেওয়াই ভালো। ফলে প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থাকার সুবাদে খেতাব জিতে নিল পূর্বাঞ্চলই।
প্রথম ইনিংসে পূর্ব ৭০৮ রানের পাহাড় তোলে। যার জবাবে দক্ষিণ থেমে যায় ৩৩৬ রানে। দক্ষিণের হয়ে লড়াই করেন তিলক বর্মা। কিন্তু মাত্র এক রানের জন্য সেঞ্চুরি হাতছাড়া করে তিনি আউট হয়ে যান। তাঁকে সঙ্গ দেওয়া চামা মিলিন্দও প্রতিরোধ গড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পূর্বের বোলারদের সামনে দক্ষিণের ইনিংস গুটিয়ে যায়।
২০১২-১৩-র পর এ বারই প্রথম দলীপ ট্রফি জয় করল পূর্বভারতের দল। সেবার মধ্যাঞ্চলকে হারিয়ে দেশের অন্যতম সেরা প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের খেতাব জিতেছিল পূর্বাঞ্চল। সেই সাফল্যের ১৪ বছর পর ফের দলীপে সাফল্য এল পূর্বাঞ্চলের ঘরে।
৩৭২ রানের লিড পাওয়ার পরও ফলো-অন করায়নি পূর্বাঞ্চল। ফলে ফের ব্যাট করার সুযোগ পান ইশান কিষাণ, বৈভব সূর্যবংশী-সহ দলের ব্যাটাররা। তবে দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই জোড়া ধাক্কা খায় তারা। অভিমন্যু ঈশ্বরন সিরাজের বলে প্রথম স্লিপে ক্যাচ দেন। এর পর বৈভবও বড় শট খেলতে গিয়ে স্টাম্পড হয়ে মাত্র ৮ রানে ফেরেন।
তবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বেশ শক্ত হাতে তুলে নেন ইশান ও শিখর মোহন। লিড ৪০০ পেরিয়ে যেতেই গিয়ার বদলে নেন ইশান। বিজয়ের বলে ছক্কা হাঁকান তিনি। এর পর পঞ্চাশ পূর্ণ করে পরের ওভারেই ৪, ৬, ৬, ৪— টানা চারটি বাউন্ডারিতে গ্যালারি মাতিয়ে দেন পূর্বাঞ্চল অধিনায়ক।
Handshakes in the middle to conclude a fantastic Final 🤝
East Zone clinch the #DuleepTrophy 2026 title by virtue of first-innings lead 🏆
#EZvSZ https://t.co/4DJjNHkAHD
— BCCI Domestic (@BCCIdomestic) September 10, 2026
মনে হচ্ছিল, ম্যাচে আরও একটি শতরান দেখতে চলেছে সবাই। কিন্তু শ্রেয়স গোপাল এবং এম ডি নিধীশ রান আটকে দেওয়ায় চাপ বাড়ে অধিনায়কের উপর। বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। ৮০ রানে থামেন ইশান। তবু তাঁর ইনিংসেই পূর্বের লিড ৫০০-র গণ্ডি পেরিয়ে যায়।
ইশান আউট হওয়ার পর শিখর মোহনও ৫২ রানে এলবিডব্লিউ হন। বুধবার, চতুর্থ দিনের শেষ দিকে কুমার কুশাগ্র এবং মহম্মদ কুনাইন কুরেশি জুটি বাঁধেন। দু’জনে মিলে ৫০-এর জুটি গড়ে দিনের বাকি সময় কাটিয়ে দেন।
ফলে চতুর্থ দিনের শেষে স্কোর ছিল—২১২/৫, মানে ৫৮৪-র লিড। বৃহস্পতিবার শেষ দিন কুমার কুশাগ্র ৪৬ রান করে ফিরে যাওয়ার পর ক্রিজে মহম্মদ কুনাইন কুরেশির সঙ্গে জুটি বাঁধেন অনুকুল। চারটি চার ও দুটি ছয় মেরে ৬৪ রান করেন তিনি। অন্য দিকে, কুরেশি ১৩টি চার ও চারটি ছয় মেরে ১১৬ রান তোলেন। ধানবাদের এই ২৪ বছর বয়সি অফ স্পিনার অলরাউন্ডারের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই ম্যাচেই অভিষেক হয় এবং সেটাই চিরস্মরণীয় করে রাখলেন তিনি। অন্যদিকে মহম্মদ শামির শততম প্রথম শ্রেণির ম্যাচও স্মরণীয় হয়ে উঠল।
অনুকুল ও কুরেশি—দুজনে মিলে প্রতিপক্ষের বোলারদের রীতিমতো হতাশ করে তোলেন। তিলক বর্মারা বোধহয় অপেক্ষায় ছিলেন, পূর্বাঞ্চল কখন শেষ করবে ইনিংস, তখনই হাত মিলিয়ে খেলা শেষ করে দেবেন। অনুকুল নিধিশের বলে পাডিক্কালের হাতে ধরে পড়ে ফিরে যান এবং শামি ব্যাট করতে নামেন ক্রিজে। তার পরেই তিলক হাত বাড়িয়ে দেন কুরেশির দিকে এবং জানিয়ে দেন, ঢের হয়েছে, এবার থামো, তোমরাই জিতলে, অনেক অভিনন্দন।
আগাগোড়াই ইশান কিষাণদের আধিপত্য বিস্তার করা এই ম্যাচে বৈভব সূর্যবংশীর কাছ থেকে আরো রান হয়তো আশা করেছিলেন তাঁর ভক্তরা। কিন্তু প্রথম ইনিংসে ৪৪ ও দ্বিতীয় ইনিংসে আটের বেশি তুলতে পারেননি বিস্ময় বালক। বরং ইশান কিষাণ বুঝিয়ে দিলেন, তিনি কোন জাতের ক্রিকেটার। প্রথম ইনিংসে ২৭০ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮০ মোট সাড়ে তিনশো রান করেন নির্বাচকদের বার্তা পাঠালেন, শুধু সাদা বলে নয়, লাল বলেও তাঁর কথা ভাবা যেতেই পারে।
দলীপ ট্রফি খেতাব জিতে চ্যাম্পিয়ন দল পেল এক কোটি টাকা। ফাইনালে হেরে যাওয়া দলও অবশ্য খালি হাতে ফিরছে না। রানার-আপ দক্ষিণাঞ্চল পুরস্কার হিসেবে পেল ৫০ লাখ টাকা।
তবে এই পুরস্কারমূল্যের এক কোটি টাকা শুধু অধিনায়ক পাবেন না, এটি পুরো বিজয়ী দলের পুরস্কারের অর্থ। খেলোয়াড় এবং সাপোর্ট স্টাফের মধ্যে এই অর্থ ভাগ করে দেওয়া হবে।
দলীপ ট্রফির আর্থিক পুরস্কারের অঙ্ক আগে ছিল আরো কম। ২০২৩ সালে দলীপে বিজয়ীর অর্থ ৪০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। অন্যদিকে, রানার আপের জন্য পুরস্কার ২০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ লাখ টাকা হয়েছিল।
অর্থাৎ, বিজয়ীর সন্মানের সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর নগদ অর্থও উপার্জন হল চ্যাম্পিয়ন দলের ক্রিকেটারদের। এ বার এই পারফরম্যান্সের বিচারে যারা আসন্ন টেস্ট সিরিজের দলে ডাক পাবেন, তাঁরা আরো লাভবান হবেন।




