দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতি ও প্রশাসন বরাবরই স্পর্শকাতর। পাহাড়ের মানুষের উন্নয়ন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই পরিস্থিতিতে গোরখাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ-র প্রশাসক হিসেবে জিটিএ-র মুখ্যসচিব স্মৃতিরঞ্জন মহান্তিকে নিয়োগ এবং উত্তরবঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় একাধিক সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ—দুটি পদক্ষেপই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
জিটিএ-র প্রধান নির্বাহী অনীত থাপা পদত্যাগ করার পর প্রায় দু’মাস ধরে পাহাড়ের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্থাটি কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে জিটিএ সভার চেয়ারম্যান ও ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদও শূন্য হয়েছে। ফলে উন্নয়নমূলক কাজ ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগ করে প্রশাসনিক কাজকে সচল রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত।
স্মৃতিরঞ্জন মহান্তি আগে জিটিএ-র প্রধান সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। ফলে পাহাড়ের প্রশাসনিক কাঠামো, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে তাঁর পরিচয় রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে উন্নয়নের কাজ থেমে না যাওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু মজুমদার প্রশাসককে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, পাহাড়ের তিন বিধায়ক এবং পদত্যাগ না-করা জিটিএ-র নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে— প্রশাসন যেন একতরফাভাবে না চলে এবং পাহাড়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামতও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পায়।
পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রশ্ন অবশ্য আলাদা। বিজেপি ‘পার্মানেন্ট পলিটিক্যাল সলিউশন’ বা পিপিএস-এর কথা বলেছে এবং সেই লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা চলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, রাস্তা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলি অপেক্ষা করে থাকতে পারে না। তাই অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত।
মুখ্যমন্ত্রীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল উত্তরবঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরবঙ্গ ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস, নদীর গতিপথে বাধা এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বেড়েছে। মিরিকে রংভাং নদীর প্রবাহ ভূমিধসে আটকে যাওয়া এবং তিস্তার প্রবাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এই অবস্থায় এনডিআরএফ, এসডিআরএফ এবং অর্জুন বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ এবং কৌশলগত এলাকায় তাদের মোতায়েনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী। দুর্যোগের পরে উদ্ধারকাজ করার চেয়ে দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, নদীর জল আচমকা বেড়ে যেতে পারে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বহু জনপদ। তাই দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মিরিকে ইতিমধ্যেই এনডিআরএফ, এসডিআরএফ ও অর্জুন বাহিনীর কর্মীরা কাজ করছেন এবং বহু মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ধরনের আগাম সতর্কতা ও দ্রুত পদক্ষেপই মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।
পাহাড়ে রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা চলবে, মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। জিটিএ-তে প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ এবং উত্তরবঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি— এই দুই ক্ষেত্রেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু মজুমদারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বাস্তব দায়িত্ব পালনেরই ইঙ্গিত দেয়।
এখন প্রয়োজন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাহাড় ও সমতল— উভয় অঞ্চলের মানুষের কাছে তার সুফল পৌঁছতে হবে। রাজনৈতিক আলোচনা তার নিজের পথে চলুক, কিন্তু উন্নয়ন ও মানুষের নিরাপত্তার কাজ থেমে থাকা উচিত নয়। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে একটি সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল ও কার্যকর প্রশাসনের পরিচয়।




