• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 1 September, 2026

আয় লুকিয়ে সন্তানের প্রাপ্য কমানো যাবে না, বাবার ‘গোপন’ উপার্জনের দায় নিল না হাইকোর্ট

আদালতের মতে, ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইনের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক কল্যাণ এবং নির্ভরশীল স্ত্রী ও সন্তানের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করা। নিজের প্রকৃত আয় সম্পর্কে তথ্য লুকিয়ে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ কোনও উপার্জনক্ষম স্বামীকে দেওয়া যায় না।

আয় লুকিয়ে সন্তানের প্রাপ্য কমানো যাবে না, বাবার ‘গোপন’ উপার্জনের দায় নিল না হাইকোর্ট

Photo: আয় লুকিয়ে সন্তানের প্রাপ্য কমানো যাবে না (AI)

নিজের প্রকৃত আয় গোপন করে কোনও অভিভাবক তাঁর সন্তানের প্রাপ্য ভরণপোষণ কমিয়ে নেওয়ার সুবিধা পেতে পারেন না। বিশেষ করে নাবালকের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত ভরণপোষণের ক্ষেত্রে উপার্জনক্ষম স্বামী যদি নিজের আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করেন, তার দায় সন্তানের উপর চাপানো যাবে না। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের।

এক নাবালিকা মেয়ের অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ ৯ হাজার থেকে কমিয়ে ৮ হাজার করা হয়েছিল। নিম্ন আদালতের সেই নির্দেশ খারিজ করে ফের অর্থ ৯ হাজারই বহাল রাখল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি উদয় কুমার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, স্বামী তাঁর প্রকৃত আয় ও আর্থিক অবস্থার তথ্য গোপন করলে সেই গোপনীয়তার সুবিধা তাঁকে দেওয়া যায় না।

মামলার সূত্রে জানা গিয়েছে, স্ত্রী এবং নাবালিকা মেয়ের জন্য অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ দাবি করা হয়েছিল। খড়্গপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর স্ত্রীকে মাসে ৭ হাজার এবং মেয়েকে মাসে ৯ হাজার দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর স্বামী সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সেশনস কোর্টে যান। তাঁর দাবি ছিল, বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় মাত্র ১৫ হাজার। কিন্তু নিজের পেশার নির্দিষ্ট বিবরণ কিংবা বেতনের প্রমাণ হিসাবে কোনও স্যালারি স্লিপ তিনি পেশ করতে পারেননি।

সেই মামলায় এমন নথি উঠে আসে যা থেকে বোঝা যায়, অতীতে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে কাজ করার সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ৫ হাজার দিরহাম। ভারতীয় মুদ্রায় তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১.০৮ লক্ষ। স্বামীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য না দেওয়ার বিষয়টি সেশনস কোর্টও লক্ষ্য করেছিল। তা সত্ত্বেও নাবালিকা মেয়ের ভরণপোষণ ৯ হাজার থেকে কমিয়ে ৮ হাজার করা হয়। সেই সিদ্ধান্তেই আপত্তি হাইকোর্টের।

বিচারপতি উদয় কুমারের পর্যবেক্ষণ, একদিকে যখন আদালতই স্বামীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়টি মেনে নিচ্ছে। তখন অন্যদিকে তাঁর আয় কমেছে, এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই সন্তানের ভরণপোষণ কমিয়ে দেওয়া যায় না। কোনও স্বামী ইচ্ছাকৃত ভাবে প্রকৃত উপার্জন গোপন করলে ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারার আওতায় তাঁর উপরই নিজের আর্থিক সামর্থ্য প্রকাশের দায় আরও বেশি বর্তায়।

আদালতের বক্তব্য, কোনও পক্ষের তথ্য গোপন করার প্রবণতাকে পুরস্কৃত করে আপিল আদালত ভরণপোষণ কমাতে পারে না। বিশেষত নাবালকের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অর্থ কমানোর ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের পিছনে যথাযথ কারণ থাকা আবশ্যক। আদালতের মতে, ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইনের মূল উদ্দেশ্য সামাজিক কল্যাণ এবং নির্ভরশীল স্ত্রী ও সন্তানের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করা। নিজের প্রকৃত আয় সম্পর্কে তথ্য লুকিয়ে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ কোনও উপার্জনক্ষম স্বামীকে দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন: ‘বিয়ের মন্ত্র ভুলে স্ত্রীকে খুন’, এই যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড নয়! হাইকোর্টে কমল সাজা

ফলে সেশনস জজের ৯ হাজার থেকে ৮ হাজারে ভরণপোষণ কমানোর সিদ্ধান্তকে ‘গুরুতর নথিগত ও আইনি ভুল’ বলে চিহ্নিত করে কলকাতা হাইকোর্ট। ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারির অতিরিক্ত সেশনস জজ, পশ্চিম মেদিনীপুরের নির্দেশ খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখল হাইকোর্ট।