• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 1 September, 2026

‘বিয়ের মন্ত্র ভুলে স্ত্রীকে খুন’, এই যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড নয়! হাইকোর্টে কমল সাজা

ঘটনার মাত্র আধ ঘণ্টা আগেও স্ত্রী ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে চা-জলখাবার খেয়েছিলেন সুজিত। তার পরেই ঝগড়া এবং আচমকা হিংসা। ফলে ঘটনাটি আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে বলে আদালত মনে করেছে।

‘বিয়ের মন্ত্র ভুলে স্ত্রীকে খুন’, এই যুক্তিতে মৃত্যুদণ্ড নয়! হাইকোর্টে কমল সাজা

Image: AI নির্মিত

স্ত্রীকে খুন করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল নিম্ন আদালত। সেই সাজা দিতে গিয়ে আদালতের যুক্তি ছিল, বিয়ের সময় উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্রে স্বামী-স্ত্রী যে ভালবাসা, স্নেহ, দায়িত্ব, অবদান ও ত্যাগের অঙ্গীকার করেছিলেন, অভিযুক্ত সেই সবই ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু শুধুমাত্র এই যুক্তিতে কোনও হত্যাকাণ্ডকে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ বলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না,স্পষ্ট করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট।

বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি স্মিতা দে-র ডিভিশন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের ওই পর্যবেক্ষণে আপত্তি জানিয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে দিয়েছে। হাই কোর্ট মনে করিয়েছে, কোনও মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতকে অপরাধের প্রকৃতি, পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

নিম্ন আদালত অভিযুক্তের হাতে তাঁর স্ত্রী খুনের ঘটনাকে ‘রেস্ট অফ দ্য রেস্ট’ বা ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ বলে মনে করেছিল। তার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল বিবাহের সময় উচ্চারিত বৈদিক মন্ত্র এবং সেই মন্ত্রের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালবাসা ও দায়িত্বের অঙ্গীকারের কথা।

আদালতের মতে, স্ত্রী সংসারে যে ভালবাসা, অবদান ও ত্যাগ করেছিলেন, তা ভুলে গিয়ে তাঁকে খুন করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
কিন্তু হাই কোর্টের বেঞ্চের মতে, বিবাহের মন্ত্র বা নৈতিক প্রত্যাশাকে একা মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি করা যায় না। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

অর্থাৎ, স্ত্রীকে খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধের গুরুত্ব আদালত অস্বীকার করেনি। তবে অপরাধ যতই নৃশংস হোক, মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’ নীতির সাংবিধানিক ও আইনি পরীক্ষায় মামলাটি উত্তীর্ণ হচ্ছে কি না, সেটিই হতে হবে মূল বিবেচনা।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের জুনে জলপাইগুড়িতে। স্ত্রীর বাপের বাড়িতে একটি পারিবারিক অশান্তির মধ্যে কুড়ুল দিয়ে স্ত্রীকে আক্রমণ করেন সুজিত দে ভৌমিক। ঘটনাটি চোখের সামনে দেখে সাত বছরের ছেলে। স্ত্রীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন তাঁর মা ও ঠাকুমাও। তাঁদের উপরেও হামলা চালানো হয়। গুরুতর আঘাতে মৃত্যু হয় স্ত্রীর। তাঁর মায়ের বুকে গভীর ক্ষত হয়। ঠাকুমার পিঠ, হাত ও চোখেও আঘাত লাগে। একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি।

প্রসঙ্গত,২০২৫ সালের এপ্রিলে নিম্ন আদালত সুজিতকে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেই রায়ের যুক্তিতেই ছিল বিয়ের সময় নেওয়া শপথের প্রসঙ্গ। বিচারক মনে করেছিলেন, স্ত্রী যে ভালবাসা, স্নেহ, অবদান ও ত্যাগ দিয়েছেন, তা ভুলে গিয়ে তাঁকে খুন করা অত্যন্ত নৃশংসতার পরিচয়। এমনকি সুজিতকে ‘ডেমন’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছিল, সংশোধনাগারে প্রশিক্ষণ বা আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিয়েও তাঁর মন বদলানো সম্ভব নয়।

হাইকোর্টের নির্দেশে তৈরি হওয়া প্রবেশন অফিসারের রিপোর্টে দেখা যায়, সুজিতের আগে কোনও অপরাধের রেকর্ড নেই। জেলেও তাঁর আচরণ ভাল ছিল এবং তিনি কাউন্সেলিং নিচ্ছিলেন। তাঁর একটি ছোট ছেলে এবং বৃদ্ধ মা-ও রয়েছেন। ঘটনার মাত্র আধ ঘণ্টা আগেও স্ত্রী ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে চা-জলখাবার খেয়েছিলেন সুজিত। তার পরেই ঝগড়া এবং আচমকা হিংসা। ফলে ঘটনাটি আগে থেকে পরিকল্পিত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে বলে আদালত মনে করেছে।

এই মামলায় সেই পরীক্ষায় নিম্ন আদালতের যুক্তি যথেষ্ট নয় বলেই মনে করেছে হাই কোর্ট। ফলে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে অভিযুক্তকে কম সাজা দেওয়া হয়েছে।এই রায় তাই শুধু একটি মামলায় সাজা কমানোর ঘটনা নয়। বিবাহের সম্পর্কের আবেগ, নৈতিকতা বা সামাজিক মূল্যবোধের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে আইনের নির্দিষ্ট মানদণ্ডকেই যে চূড়ান্ত গুরুত্ব দিতে হবে, সেই বার্তাই দিল কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চ।

আইনের চোখে অপরাধের শাস্তি হবে, কিন্তু সংশোধনের দরজা বন্ধ করে দেওয়া নয়—এই মানবিক বার্তাই যেন উঠে এল এই রায়ে।