• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 1 September, 2026

হিমালয়ের বিপর্যয়, উদ্বেগ ভারতেও

জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নেপালের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাহাড়ে রাস্তা, সুড়ঙ্গ, বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃতির সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আরও কঠোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু এমন উন্নয়ন নয় যা একদিন পাহাড়ের সামান্য পরিবর্তনেই বিপুল প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

হিমালয়ের বিপর্যয়, উদ্বেগ ভারতেও

Image: IANS

নেপালের ভয়াবহ বন্যা এখন আর শুধু একটি দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা জল, কাদা, পাথর আর ধ্বংসস্তূপ ভারতীয় উপমহাদেশের সামনে এক গভীরতর প্রশ্নও তুলে দিয়েছে— বদলে যাওয়া হিমালয়ের সঙ্গে আমরা কি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রস্তুত হচ্ছি? ২৬ আগস্টের সেই আকস্মিক বিপর্যয়ের পর নেপালে মৃতের সংখ্যা ৯০০ পেরিয়ে গিয়েছে। ৩১ আগস্টের হিসাবে ৯০৩টি দেহ উদ্ধার হয়েছে এবং প্রায় ৪,২৪৭ জন এখনও নিখোঁজ। নেপালের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, নিখোঁজ বিদেশির সংখ্যা প্রায় ৫৯০।

কিন্তু সংখ্যার হিসাব দিয়ে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বোঝা সম্ভব নয়। নদীর স্রোতে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা, বিদ্যুৎকেন্দ্র। কোথাও গোটা জনপদ কাদার নীচে চাপা পড়েছে, কোথাও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে রয়েছেন শত শত শ্রমিক। বহু পরিবার দিনের পর দিন হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র এবং নিখোঁজদের তালিকার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে— হয়তো কোনও খবর পাওয়া যাবে, হয়তো প্রিয় মানুষটি এখনও বেঁচে আছেন।

আর এই অপেক্ষার সঙ্গে ভারতের বহু পরিবারও আজ যুক্ত। নেপাল ও তিব্বতের দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে বিপর্যয়ের সময় বহু ভারতীয় পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত মানুষ ছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের আগের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩২০ জন ভারতীয় এখনও নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে। একই সঙ্গে চিনের দিক থেকে প্রায় ৪০০ ভারতীয় নিরাপদে রয়েছেন বলে জানানো হয়েছিল এবং অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে নেপালে পৌঁছেছেন। হিসাবটি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। তাই নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।

এই অবস্থায় ভারতের প্রথম দায়িত্ব অবশ্যই তার নাগরিকদের উদ্ধার করা। কিন্তু সেই সঙ্গেই তার বড় দায়িত্ব প্রতিবেশী নেপালের পাশে দাঁড়ানো। সেই কাজ শুরু হয়েছে। ভারত উদ্ধার ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ দলও পাঠিয়েছে। নেপালের সেনার সঙ্গে সমন্বয় করে ভারতীয় নাগরিকদের উদ্ধারের কাজ চলছে। ৩০ আগস্ট একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পাঁচ চিনা ও সাত ভারতীয়-সহ ১৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট নেপালের রসুয়া জেলার চিলিমে থেকে আরও তিন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত-নেপাল সম্পর্ক কোনও সাধারণ প্রতিবেশী সম্পর্ক নয়। দুই দেশের মানুষের মধ্যে সীমান্তের কাঁটাতারের চেয়েও শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে। নেপালের বহু মানুষ ভারতে কাজ করেন, ভারতের মানুষ নিয়মিত নেপালে যান। ধর্ম, সংস্কৃতি, ব্যবসা এবং পারিবারিক সম্পর্ক দুই দেশকে বহু শতাব্দী ধরে কাছাকাছি রেখেছে। ফলে নেপালের বিপর্যয়ে ভারতীয় মানুষের উদ্বেগ স্বাভাবিক এবং ভারতের সহায়তাও স্বাভাবিক মানবিক দায়িত্ব।

তবে এই বিপর্যয় শুধু উদ্ধার ও ত্রাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কারণ হিমালয় দ্রুত বদলাচ্ছে। এবারের বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে হিমবাহের নীচে শিলা ও বরফের ভয়াবহ ধস থেকে। সেই ধসের ফলে নদীতে বিপুল পরিমাণ জল ও পাথর নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে নদীকে মৃত্যুস্রোতে পরিণত করেছে। বিজ্ঞানীরা এখনও সতর্কভাবে ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করছেন। সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের সম্পর্ক এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট— তাপমাত্রা বাড়ার ফলে হিমালয়ের হিমবাহ, বরফ, পারমাফ্রস্ট এবং পাহাড়ের ঢালে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। ফলে এ ধরনের বিপদের সম্ভাবনাও বাড়ছে।

এই জায়গাতেই ভারতের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি। নেপালের নদীগুলি শুধু নেপালের নদী নয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা বহু নদী ভারত হয়ে সমতলে পৌঁছয়। বন্যার জল সীমান্ত মানে না। নেপালে পাহাড়ি ঢল নামলে তার অভিঘাত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই নেপালের বিপর্যয়ের পরে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিকে সতর্ক থাকতে হয়েছে। ফলে নেপালের দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা আসলে ভারতের নিজের নিরাপত্তাকেও শক্তিশালী করা।

এখানে ভারত-নেপাল যৌথভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি হিমালয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। হিমবাহ, হ্রদ, নদীর জলস্তর, পাহাড়ের ঢাল এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের তথ্য নিয়মিত ভাগ করে নেওয়া দরকার। শুধু বন্যা শুরু হওয়ার পরে সতর্কবার্তা দিলে হবে না। কোথায় নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে, কোন নদীর জল দ্রুত বাড়ছে, কোথায় পাহাড়ের গায়ে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে— সেসব তথ্য আগেই জানা গেলে হাজার-হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।

এক্ষেত্রে চিনের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নেপাল জানিয়েছে, উজানে জলপ্রবাহ বাড়ার খবর চিন তাদের জানিয়েছিল। ভারতও হিমালয়ের নদী ও আবহাওয়ার তথ্যের ক্ষেত্রে নেপাল ও চিনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় চাইতে পারে। হিমালয়কে রাজনৈতিক সীমারেখায় ভাগ করা গেলেও তার নদী, বরফ, বায়ু ও ভূপ্রকৃতিকে ভাগ করা যায় না।

আর একটি বিষয় এই বিপর্যয় নতুন করে সামনে এনেছে— তা হলো, অপরিকল্পিত উন্নয়ন। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নেপালের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাহাড়ে রাস্তা, সুড়ঙ্গ, বাঁধ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির ক্ষেত্রে প্রকৃতির সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে আরও কঠোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু এমন উন্নয়ন নয় যা একদিন পাহাড়ের সামান্য পরিবর্তনেই বিপুল প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ উদ্ধার। এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। নতুন করে ভোটেকোশী নদীর জল বাড়ায় নেপালে আবার বন্যার সতর্কতা জারি হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদেরও জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে হচ্ছে। ভারতের উচিত নেপালের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়ানো— ত্রাণ, চিকিৎসা, উদ্ধার, যোগাযোগ পুনর্গঠন, মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং পরবর্তী পুনর্বাসন, সব ক্ষেত্রেই। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিপর্যয়কে একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও গ্রহণ করতে হবে। হিমালয়কে শুধু পর্যটন, তীর্থযাত্রা, জলবিদ্যুৎ বা সীমান্ত নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। তাকে দেখতে হবে একটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশব্যবস্থা হিসেবে।

নেপালের এই দুর্যোগ তাই শুধু নেপালের নয়। এটি ভারতের জন্যও সতর্কবার্তা। আজ ভেসে গিয়েছে নেপালের গ্রাম, কাল বিপদ আসতে পারে ভারতের সমতলে। আজ অন্যের নদী ফুলে উঠেছে, কাল সেই নদীর জল আমাদের ঘরেও পৌঁছতে পারে। তাই প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো যেমন মানবিক কর্তব্য, তেমনই নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষারও বুদ্ধিমান পথ।

হিমালয় যদি সতর্ক করে, তাকে শুনতে হবে— দুই দেশের সরকারকে, বিজ্ঞানীদের এবং সাধারণ মানুষকেও। কারণ পাহাড়ের বিপদ সীমান্ত মানে না। তার মোকাবিলাও তাই একা কোনও দেশের পক্ষে সম্ভব নয়।