মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে এসআইআর-এর পরে ভোটার তালিকা নিয়ে গঠিত আপিল ট্রাইব্যুনালগুলিতে জমা পড়া মামলার বিস্তারিত তথ্য দিতে বলেছে। কতগুলি মামলা এখনও বিচারাধীন, কতগুলি নিষ্পত্তি হয়েছে, কতগুলি নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন এবং কতগুলি নাম বাদ দেওয়ার আবেদন— এই তথ্য আদালত জানতে চেয়েছে। একই সঙ্গে, যাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চেয়েছে আদালত।
এই তথ্যের গুরুত্ব সহজেই বোঝা যায়। আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৩ হাজার আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তার মধ্যে ৭৫,৪৪৩ জনের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ, আপিলের সুযোগ পাওয়ার পর বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের ভোটার তালিকায় ফিরে আসার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য এখানেই যে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনও ভুল বা বিভ্রান্তির কারণে নাম বাদ পড়লেও তা সংশোধনের পথ খোলা থাকা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একই সঙ্গে আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— মোট আপিলের তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা এত কম কেন? আদালতে জানানো হয়েছে, মোট আপিলের সংখ্যা প্রায় ৩৮ লক্ষ। তার মধ্যে প্রায় ৭ লক্ষ আবেদন এসেছে এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে, যাঁরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। বাকি প্রায় ৩১ লক্ষ আবেদন করা হয়েছে ভোটার তালিকায় কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে। এই সংখ্যাগুলির প্রকৃত চরিত্র ও পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে আদালত। কারণ, একই ব্যক্তিকে ঘিরে অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার আবেদন, কিংবা একাধিক আপিল থাকলে মোট সংখ্যার ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে মূল বিষয় কোনও রাজনৈতিক দল বা পক্ষের জয়-পরাজয় নয়। মূল বিষয় হল ভোটারের অধিকার। একজন যোগ্য নাগরিকের নাম যদি ভুল করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়, তবে সেই ভুলের সংশোধন যত দ্রুত সম্ভব হওয়া উচিত। কারণ ভোটের দিন এসে জানা গেল যে নাম নেই, তখন আর সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকে না। একটি নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ার পর নাগরিকের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিলেও সেই নির্দিষ্ট নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ আর ফিরে আসে না।
এই কারণেই আদালতে ভোটারদের অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি উঠেছে। বাদ পড়া ভোটারদের আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত কি না, তা নিয়ে আদালত নির্বাচন কমিশনের তথ্য চেয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে— কাউকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং কাউকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রভাব এক নয়। অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু ভুলভাবে বাদ পড়লে একজন নাগরিক সরাসরি তাঁর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। ফলে সময়ের গুরুত্ব এখানে অনেক বেশি।
আবার, ভোটার তালিকায় ভুলভাবে কোনও নাম থাকলে সেই বিষয়ে আপত্তির অধিকারও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বাদ দেওয়ার আবেদনগুলিকে উপেক্ষা করা বা গুরুত্বহীন বলে দেখার সুযোগ নেই। একটি নির্ভুল ভোটার তালিকার জন্য অন্তর্ভুক্তি এবং বর্জন— দুই ধরনের আপিলই ন্যায়সঙ্গতভাবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা দরকার। তবে নির্বাচনের সময়সূচি সামনে থাকলে কোন ধরনের মামলায় তাৎক্ষণিকভাবে ভোটারের অধিকার সুরক্ষিত করা বেশি জরুরি, সে বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকার অবশ্যই বিবেচ্য হতে পারে।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন রয়েছে এবং পরবর্তীতে লোকসভা নির্বাচনও রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আপিলের নিষ্পত্তি যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তার প্রভাব ভবিষ্যৎ নির্বাচনে পড়তে পারে। সুপ্রিম কোর্টও স্পষ্ট করেছে যে, প্রয়োজনে আরও ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এখানে নির্বাচন কমিশন, ট্রাইব্যুনাল এবং আদালত— তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই– প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হয়। ভোটারকে বারবার দপ্তরে ছুটতে না হয়, তাঁর আবেদনের অবস্থান যেন সহজে জানা যায় এবং সিদ্ধান্তের পরে ভোটার তালিকায় তার বাস্তব প্রতিফলন যেন দ্রুত ঘটে— এই বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।




