• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 26 August, 2026

‘ভিনরাজ্যের ক্রিকেটারদের বাংলার হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলার দিন শেষ’ — জানিয়ে দিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

ভিনরাজ্য থেকে এসে বয়স ভাঁড়িয়ে বা আধার কার্ডে ঠিকানা বদলে বাংলার হয়ে খেলার দিন শেষ। এ বার থেকে বাংলার ছেলেরাই বাংলার হয়ে বিভিন্ন জাতীয় স্তরের

‘ভিনরাজ্যের ক্রিকেটারদের বাংলার হয়ে রঞ্জি ট্রফি খেলার দিন শেষ’ — জানিয়ে দিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

ফাইল চিত্র

ভিনরাজ্য থেকে এসে বয়স ভাঁড়িয়ে বা আধার কার্ডে ঠিকানা বদলে বাংলার হয়ে খেলার দিন শেষ। এ বার থেকে বাংলার ছেলেরাই বাংলার হয়ে বিভিন্ন জাতীয় স্তরের ক্রিকেটে খেলবে। এ বার এই অনৈতিক প্রথা রুখতে রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা (সিএবি) যে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে, তা নিয়ে বাংলার ক্রিকেট মহলে জোর চর্চা হচ্ছে ঠিকই। তবে সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই ব্যাপারে আর কোনোরকম জাল-জোচ্চুরি বরদাস্ত করা হবে না।

গত কয়েক বছরে যারা এমন চেষ্টা করেছে এবং ভুয়ো নথিপত্র দিয়ে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এ রাজ্যে ক্রিকেট খেলেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপও নিচ্ছে সিএবি। এমন পঞ্চাশেরও বেশি ক্রিকেটারকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে বলে সিএবি-র দাবি, যারা একাধিকবার আধার কার্ডে ঠিকানা বদল করে ও বয়স বদল করে নিজেদের বাংলার ক্রিকেটার ‘বানিয়ে’ বঙ্গ ক্রিকেটের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাদের দু’বছরের জন্য সব স্তরের ক্রিকেট থেকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিএবি।

এই প্রসঙ্গে সিএবি সভাপতি ও প্রাক্তন ভারতীয় বোর্ড সভাপতি ও অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ‘দৈনিক স্টেটসম্যান ডিজিটাল’-কে জানান, ‘অনেক হয়েছে। এতদিন ক্রিকেট প্রশাসনকে ধোঁকা দিয়ে অনেকে অন্য রাজ্য থেকে এসে বাংলার ছেলে বলে ক্রিকেট খেলে গিয়েছে। এখন থেকে আর তা হবে না। আধার কার্ডে আপডেটের ইতিহাস যাচাই করা যাচ্ছে যখন, তখন কাউকে রেয়াত করা হবে না। রঞ্জি ট্রফির মতো জাতীয় স্তরের ক্রিকেটেও আর বাংলার বাইরের ছেলেরা খেলতে পারবে না’।

এর আগে বয়স ভাঁড়িয়ে এবং ঠিকানা বদলে একাধিক ক্রিকেটার বাংলার হয়ে খেলে গিয়েছেন বলে বহুবার অভিযোগ উঠেছে। ভোটার কার্ড, আধার কার্ডের মতো সরকারি নথি জাল করেও অনেকে নিজেদের বাংলার বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়ে কলকাতায় ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আগে ক্রিকেটারদের এই সব নথি ও তথ্য যাচাইয়ের কোনও বিজ্ঞানসম্মত উপায় ছিল না। তবে এখন থেকে আধার কার্ডের ‘আপডেট হিস্ট্রি’ জানার উপায় আছে।

ভারতীয় ক্রিকেটে, বিশেষ করে জুনিয়র এবং বয়সভিত্তিক (যেমন অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৯ এবং অনূর্ধ্ব-২৩) টুর্নামেন্টে বয়স ভাঁড়ানো এবং ভুয়ো ঠিকানা সংক্রান্ত জালিয়াতি রুখতে রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাগুলি এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ক্রিকেটারদের আধার কার্ডে তথ্য পরিবর্তনের ইতিহাস যাচাই করা বাধ্যতামূলক করেছে।

অনেক সময় ক্রিকেটাররা কম বয়সী টুর্নামেন্টে খেলার জন্য তাদের আসল জন্মতারিখ পরিবর্তন করে। আধার কার্ডের ইতিহাস যাচাই করলে ধরা পড়ে যায় যে জন্মতারিখটি সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা। ক্রিকেটাররা তাদের নাম, ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করে অন্য কোনো রাজ্যের হয়ে অন্যায়ভাবে খেলার চেষ্টা করছে কিনা, তা এই ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

বাইরের রাজ্যের খেলোয়াড়রা যাতে অনিয়মিতভাবে স্থানীয় কোটায় সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতেও এই প্রক্রিয়া সাহায্য করে। এ বার এই প্রক্রিয়াতেই ভুয়ো ক্রিকেটারদের ধরা হচ্ছে এবং তাদের শাস্তিও দেওয়া হচ্ছে। সিএবি সভাপতি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা পঞ্চাশ জনেরও বেশি ক্রিকেটারকে চিহ্নিত করেছি এবং তাদের সাসপেন্ড করেছি। ফলে এখন থেকে এ ভাবে জালিয়াতি করে আর এই রাজ্যে খেলতে পারবে না কেউ। যারা সত্যিকারের এ রাজ্যের বাসিন্দা ও সঠিক বয়সি, তারাই রাজ্যদলের হয়ে এবং রাজ্যের ক্লাবের হয়ে খেলতে পারবে’।

কিন্তু কীভাবে আধার আপডেটের ইতিহাস চেক করা হয়?

সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে সহজেই এই ইতিহাস দেখে নিতে পারে ক্রিকেট প্রশাসকেরা। ভারতের ইউআইডিএআই (UIDAI)-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের ১২ ডিজিটের আধার নম্বর বা ভার্চুয়াল আইডি এবং সিকিউরিটি ক্যাপচা কোড দিতে হয়। আধারের সাথে রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরে আসা ওটিপি সাবমিট করতে হয়। এর পরই দেখা যায়, ক্রিকেটারের আধার কার্ডে অতীতে কখন কী তথ্য আপডেট বা পরিবর্তন করা হয়েছে।

বয়স ও ঠিকানা নিয়ে কারচুপি জুনিয়র ক্রিকেটে নতুন সমস্যা নয়। বয়স কম দেখিয়ে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় খেলার অভিযোগ বহু বার উঠেছে। ভুয়ো ঠিকানা দেখিয়ে ভিনরাজ্য থেকে এসে বাংলার ছেলে হিসেবে খেলার অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে প্রকৃত বয়সের এবং এ রাজ্যের ক্রিকেটাররা সুযোগ হারান। সেই সমস্যা ঠেকাতেই এ বার নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সিএবি-সহ সব রাজ্যই।

এই প্রসঙ্গে সৌরভ জানান, ‘আমরা এই ব্যাপারে বিসিসিআই যে নিয়ম অনুসরণ করছে, হুবহু সেই নিয়মই অনুসরণ করছি, যাতে আর কোনো জালিয়াতি না হয়’। নতুন ব্যবস্থায় শুধু একটি নথি নয়, ক্রিকেটারের জন্মের সার্টিফিকেট, আধার কার্ড এবং স্কুলের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। এবং প্রয়োজন হলে নথির সত্যতা যাচাই করতে আধার আপডেট হিস্ট্রিও যাচাই করা হচ্ছে।

বিসিসিআইয়ের অবস্থান অবশ্য বহু দিন ধরেই স্পষ্ট—বয়স নিয়ে কোনও রকম কারচুপি বরদাস্ত করা হবে না। ২০২০ সালে বোর্ড জানিয়েছিল, ভুয়ো বা কারচুপি করা জন্মের শংসাপত্র জমা দিলে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারকে দু’বছরের জন্য সব ধরনের বিসিসিআই ও রাজ্য সংস্থার ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত করা হতে পারে। সেই নির্দেশ মেনেই বাংলায় এসে ভুয়ো নথি দিয়ে খেলা ক্রিকেটারদের দু’বছর সাসপেন্ড করা হয়েছে।

সেই সময় (২০২০) বিসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ই। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিটি বয়সভিত্তিক স্তরে সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি করতে আমরা দায়বদ্ধ। বয়স নিয়ে প্রতারণা বন্ধ করতে বিসিসিআই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আগামী ঘরোয়া মরসুম থেকে আরও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা স্বেচ্ছায় নিজেদের ভুল স্বীকার করবে না, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে এবং দুই বছরের জন্য নির্বাসিত করা হবে’। এখন সৌরভ সিএবি-র দায়িত্ব নিয়ে সেই নিয়মই চালু কঠোরভাবে মেনে চলছেন।

নতুন কড়াকড়ির ফলে জুনিয়র ক্রিকেটারদের সামনে তাই বার্তাটা একেবারে পরিষ্কার— বয়স কমিয়ে বা ভুয়ো ঠিকানা দিয়ে খেলার দিন শেষ। কাগজে বয়স ও ঠিকানা বদলে মাঠে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তা ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল এবং সেক্ষেত্রে এমন শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে ক্রিকেট কেরিয়ার বিপন্ন হতে পারে। আর সিএবি-র এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য একটাই— যেন সত্যিকারের যোগ্য ক্রিকেটাররাই বাংলায় খেলার সুযোগ পায়, কোনও ভুয়ো বয়স ও ঠিকানার সুবিধা নিয়ে কেউ নয়।