ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি গত কয়েক বছরে এমন এক পথে এগিয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে কাজ করেছে আধিপত্যবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ। একদিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপ, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি এবং কিউবার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ; অন্যদিকে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান থেকে সরে আসা এবং ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপ— এই দুই প্রবণতা মিলে বিশ্বের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও অস্বচ্ছ করে তুলেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্পবাদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি কি আমেরিকায় তৈরি হচ্ছে?
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর সেই সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল ছিল না। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তখন অর্থনীতি, সামাজিক কল্যাণ কিংবা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এমন কোনও স্পষ্ট বিকল্প হাজির করতে পারেনি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিপুল সম্পদ অল্প কিছু ধনী মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিরুদ্ধেও ওই দলটি যথেষ্ট শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচনে জোহারান মামদানির বিজয় সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। মানুষের মৌলিক চাহিদাকে বাজারের লাভের হিসাবের ঊর্ধ্বে রাখার কথা বলে তিনি নির্বাচনে জয়ী হন। একই সঙ্গে গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরি করেন। তাঁর সাফল্য শুধু নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফলও এই প্রবণতাকে জোরালো করেছে। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদের মতো প্রগতিশীল প্রার্থীর সাফল্য এবং ফ্লোরিডায় অ্যাঞ্জি নিক্সনের ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়ন পাওয়ায় দেখা যাচ্ছে, বড় অর্থের ওপর নির্ভর না করেও জনভিত্তিক রাজনীতি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এমন দেশে, যেখানে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে ঠান্ডা যুদ্ধের স্মৃতি ও কমিউনিজমের ভয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
এই পরিবর্তনের পেছনে বার্নি স্যান্ডার্সের দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। তাঁর সমাজতন্ত্র মূলত ইউরোপীয় সামাজিক গণতন্ত্রের কাছাকাছি— রাষ্ট্রের হাতে সব উৎপাদনব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ধারণা নয়। স্বাস্থ্য পরিষেবা, সাশ্রয়ী বাসস্থান, শিশু পরিচর্যা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং ধনীদের ওপর বেশি কর— এসব দাবিকে তিনি বহু বছর ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজসহ আরও কয়েকজন তরুণ নেতা এই রাজনীতিকে নির্বাচনী সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
আজকের নতুন প্রজন্ম সেই রাজনীতিকে আরও বিস্তৃত করছে। তাদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের পরিচর্যায় সরকারি সহায়তা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর মতো প্রস্তাব তারা সামনে আনছে। পাশাপাশি ইজরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার মতো প্রচলিত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিরও সমালোচনা করছে। অর্থাৎ তাদের রাজনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; আমেরিকার বিশ্বভূমিকাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
তবে এই উত্থানকে এখনই চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রাথমিক নির্বাচনে সাফল্য পাওয়া এবং সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী সাংগঠনিক যন্ত্রের মোকাবিলা করা এক বিষয় নয়। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পুরনো নেতৃত্বও কতটা আন্তরিকভাবে এই নতুন প্রার্থীদের পাশে দাঁড়াবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওঠানামা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংস্কৃতিগত বিভাজন— সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।
তবু এই নতুন রাজনৈতিক প্রবণতার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। আমেরিকার বহু মানুষ এখন শুধু পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংঘাত নয়, জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধান চান। মূল্যবৃদ্ধি, বাসস্থানের ব্যয়, স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ‘মানুষ আগে, বাজার পরে’ ধরনের বার্তা যদি সাংস্কৃতিক বিভাজনকে অতিক্রম করতে পারে, তবে মার্কিন রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছেও এই পরিবর্তনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের নতুন প্রবক্তারা তুলনামূলক ন্যায্য বাণিজ্য, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছেন। ভারতের মতো দেশের জন্যও এমন একটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি স্বস্তিদায়ক হতে পারে, যেখানে একতরফা চাপ বা বাণিজ্য নীতি চাপিয়ে দেওয়ার বদলে আলোচনার গুরুত্ব বেশি।
আমেরিকা এখন কোন ধরনের সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থা চায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র সেই প্রশ্নের একটি বিকল্প উত্তর সামনে আনছে। তার সাফল্য এখনও নিশ্চিত নয়, কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে যে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে, সেটিই ইতিমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা।




