দিল্লির যন্তরমন্তর ফের উত্তাল। শুক্রবার সেখানে জড়ো হয়েছিলেন প্রচুপ মানুষ। দাবি একটাই, জাতপাতের ভিত্তিতে নয়, আর্থিক অবস্থার নিরিখে ঠিক হোক সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় সংরক্ষণের (Reservation) সুযোগ। পুলিশ প্রথমে অনুমতি দেয়নি যন্তরমন্তরে জমায়েতের। পরে রামলীলা ময়দানে ৫০০ জনের সমাবেশের ছাড়পত্র মেলে। কিন্তু আয়োজকদের অভিযোগ, ভিড় কমাতেই স্থান বদলের কৌশল নিয়েছে প্রশাসন।
এই আন্দোলনের নাম রিজার্ভেশন হটাও আন্দোলন (Reservation Hatao Andolan), সংক্ষেপে আরএইচএ (RHA)। ইনস্টাগ্রামে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় ছাপান্ন লক্ষ অনুগামী জুটিয়ে ফেলেছে এই পেজ। নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে জাতপাতের রাজনীতির শিকার নাগরিকদের সংগঠন হিসেবে, যাঁরা মেধার ভিত্তিতে সুযোগ চান। আম্বেদকরের বিখ্যাত ডাক ধার করে তাঁদের স্লোগান, শিক্ষিত হও, প্রতিবাদ করো, সংগঠিত হও।
নিট বিতর্কের রেশ ধরেই জন্ম
বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, এই আন্দোলনের শিকড় লুকিয়ে নিট (NEET) পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে হওয়া মাসব্যাপী তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদে। সেই আন্দোলনের চাপে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। তার পরই সমাজমাধ্যম-নির্ভর একের পর এক ইস্যুভিত্তিক প্রচার মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। জ্বালানিতে ইথানল মেশানো নিয়ে গড়ে ওঠা প্রচার তারই একটি উদাহরণ। রিজার্ভেশন হটাও আন্দোলনও সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিকতম সংযোজন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, অনুগামীর সংখ্যা বাড়লেই কি নীতি বদলে যায়। তপশিলি জাতি, তপশিলি জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) কয়েক দশকের সামাজিক ও শিক্ষাগত বঞ্চনার ইতিহাসকে উপেক্ষা করা যায় না বলেও মত তাঁদের। উল্টো দিকে সমর্থকদের যুক্তি, প্রায় আট দশক পার হয়ে যাওয়া সংরক্ষণ ব্যবস্থা আদৌ লক্ষ্যপূরণ করছে কি না, তা নিয়ে এ বার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত সরকারের।
বাংলার প্রেক্ষাপট আলাদা
জাতীয় স্তরের এই বিতর্কের ঢেউ পশ্চিমবঙ্গেও এসে পড়ছে, তবে এখানকার গল্পটা কিছুটা ভিন্ন খাতে বইছে। ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যের ২০১০ সালের পরবর্তী ওবিসি তালিকা বাতিল করে দেয়। ওই তালিকায় ছিল ৭৭টি মুসলিম ও ৩৬টি হিন্দু সম্প্রদায়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই ওই তালিকা তৈরি হয়েছিল।
চলতি বছরের মে মাসে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বিধানসভা ভোটে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি জিতে সরকার গড়ে বিজেপি, মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী। নতুন সরকার হাইকোর্টের রায় মেনে ২০১০ সালের আগের ৬৬টি শ্রেণিকেই ওবিসি তালিকাভুক্ত করে এবং সংরক্ষণের হার ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনে বিধানসভায় সংশোধনী বিল পাশ করিয়ে। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের করা সুপ্রিম কোর্টের আপিলও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে। এক পক্ষ একে স্বচ্ছতার পক্ষে পদক্ষেপ বলছে, অন্য পক্ষের অভিযোগ, লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এই টানাপোড়েনে।
দুই যুক্তি, দুই বাস্তবতা
এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান। এক পক্ষের বক্তব্য, জন্মের ভিত্তিতে নয়, আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে হোক সহায়তা, তা না হলে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্য পক্ষের যুক্তি, সংবিধান স্বীকৃত এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা কোনও দয়া নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ। এই বিতর্কের সহজ কোনও একরৈখিক সমাধান নেই, আর তাই আদালত থেকে রাজপথ, সর্বত্র চলছে টানাপোড়েন।




