মঙ্গলবার গভীর রাতে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে তিলোত্তমা। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুন লেগে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়েই মৃত্যু হয়েছে তাঁদের। তবে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। মৃতদের প্রায় সকলের শরীরেই মিলেছে পোড়ার চিহ্ন। যদিও সরাসরি আগুনে ঝলসে তাঁদের মৃত্যু হয়নি বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।
বিষয়টি ঠিক কী? অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ‘শিখা ইন’-এর ঘটনায় প্রথমে মনে করা হয়েছিল, মৃতদের কেউই সরাসরি আগুনে পুড়ে যাননি। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাসের সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করে রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তার ফলেই একে একে অচৈতন্য হয়ে পড়েন আবাসিকরা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের মৃত্যু হয়।
তবে মৃতদের শরীরে পোড়ার চিহ্ন কীভাবে এল, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে একটা সময় পর আবাসিকরা সকলেই অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় হোটেলের ভিতরে দাউদাউ করে জ্বলছিল আগুন। দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর আগেই আগুনের তীব্রতায় হোটেলের ভিতরে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। সেই তাপেই অচৈতন্য অবস্থায় থাকা আবাসিকদের শরীরে পোড়ার চিহ্ন তৈরি হতে পারে।
অচৈতন্য অবস্থায় থাকার কারণে তাঁরা সেই পোড়া অনুভব করতে পারেননি। ফলে আর্তনাদও করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। অর্থাৎ, সরাসরি আগুনে ঝলসে গিয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়নি। বরং কার্বন মনোক্সাইড-সহ বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে দমবন্ধ হয়েই মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্তের পর প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত তদন্তকারীরা।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার রাত পৌনে ২টো নাগাদ। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আচমকাই আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ভরে যায় হোটেলের একাধিক তলা। আটকে পড়েন বহু আবাসিক। কেউ জানলা দিয়ে বেরনোর চেষ্টা করেন, কেউ আবার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বহু আবাসিককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও মৃত্যু হয় ৯ জনের। মৃতদের মধ্যে ৮ জনই বাংলাদেশের নাগরিক। অপর এক জন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। প্রায় পাঁচ মাস আগে তিনি ওই হোটেলে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
এদিকে ‘শিখা ইন’-এর অগ্নিকাণ্ডের পর নিউ মার্কেট এলাকার একাধিক হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতিমধ্যেই ১৭টি হোটেলকে শোকজ করেছে দমকল। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় গাফিলতির অভিযোগে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না মিললে সংশ্লিষ্ট হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যেই ১১টি হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর শহরের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলিতে নজরদারি বাড়িয়েছে পুরসভা ও দমকল। বৃহস্পতিবার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ৯টি গেস্ট হাউস এবং ৪টি রেস্তরাঁকে শোকজ করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব চাওয়া হয়। শুক্রবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও ১৭টি হোটেল।
এর পাশাপাশি নতুন করে মার্কুইজ স্ট্রিটের ১০টি হোটেলকেও শোকজ নোটিস ধরিয়েছে দমকল। তালিকায় রয়েছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ৫টি, এসএন ব্যানার্জি রোডের ১টি এবং তপসিয়া রোডের ১টি হোটেলও। প্রত্যেক হোটেল মালিকের কাছেই অগ্নিনিরাপত্তা-সহ যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জবাব চাওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই জবাব দিতে হবে।
দমকল সূত্রে খবর, কোনও হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট হোটেল বা রেস্তরাঁ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। ‘শিখা ইন’-এর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরেই সামনে এসেছে সেখানে অগ্নিনিরাপত্তার একাধিক গাফিলতির অভিযোগ। এমনকী হোটেলের পিছনের জরুরি বেরোনোর পথও পাঁচিল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। ফলে আগুন লাগার পর আবাসিকদের বেরিয়ে আসার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিষাক্ত ধোঁয়া ও তীব্র তাপের মধ্যে আটকে পড়েই প্রাণ হারান ৯ জন।




